Wednesday, 10 August 2022

অসিত কুমার পাল--নারী জীবনের সার্থকতা

অসিত কুমার পাল--
নারী জীবনের সার্থকতা
____________________

সমীরণ একটা বখে যাওয়া ছেলে, বয়স চব্বিশ পঁচিশ ।
তার বাবা ফুটপাতের খুচরো ব্যবসায়ী, মা পাড়ার এর ওর বাড়িতে টুকটাক কাজ করে সংসারটা কোনরকমে চালিয়ে নেয় । সমীরণ ইস্কুলে ভর্তি হয়েছিল বটে , পড়ায় মন না থাকলেও পাশ ফেল না থাকার সুযোগে ক্লাস এইট পর্যন্ত উঠেছিল । কিন্তু তারপরে তাকে স্কুল ছাড়িয়ে একটা মুদিখানার দোকানে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল । মাসকয়েক পরে দোকানের টাকা চুরি করতে গিয়ে সে ধরা পড়ে । সেই থেকে আর কেউই তাকে কাজে রাখতে চাইল না ।

তারপরে অন্য কোন কাজের চেষ্টা না করে  সমীরণ পাড়ার ক্লাবে গিয়ে ক্যারাম পেটে নয়তো মেয়েদের ইস্কুলের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে সময় কাটাতে থাকে । আরো কিছু বখাটে ছেলের পাল্লায় পড়ে সে মদ গাঁজা খেতেও শিখে গেল । নেশার পয়সা জোগাড় করতে কখনো সে বাবার তবিল থেকে চুরি করত আবার কখনো রাতে কারো বাগান থেকে নারকেল কলা কাঁঠাল ইত্যাদি চুরি করে সস্তায় কাউকে বেচে দিত । বার দুয়েক চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে তাকে চড়থাপ্পড় খেতেও হয়েছে । মেয়েদের পিছনে ঘুরঘুর করলেও তার কালো রোগাটে চেহারা আর নোংরা  পোশাক দেখে কেউ তাকে পাত্তা দিত না ।

 রমলা সমীরনের গ্রামেরই মেয়ে তবে অন্য পাড়ায় থাকে । বাবা নেই , মা লোকের বাড়িতে কাজ করে  । বয়স  ত্রিশ পেরিয়ে গেলেও গরীব ঘরের কালো রোগাটে মেয়ে বলে বিয়ে দেওয়া যায়নি । বছর কয়েক আগে সে শহরের এক নার্সিং হোমএ আয়ার কাজ জোগাড় করেছে । রোজ দুপুরে বাস ধরে শহরে যায় আর রাত আটটা নাগাদ ফিরে আসে , কোন কোনদিন একটু দেরীও হয়ে যায় । বাসরাস্তা থেকে গ্রামে ঢুকতে  খানিকটা জঙ্গুলে জায়গা আছে , কাছে একটা ভাঙাচোরা চালাঘরও আছে । রাতের অন্ধকারে সে জায়গাটা পার হতে অনেকেই ভয় পায় । কিন্তু রোজ ওই রাস্তা দিয়েই ফিরতে হয় বলে রমলা ব্যাগে একটা ছোট টর্চ রেখেছে ।

একদিন বিকালে সমীরণ বাসরাস্তার মোড়ে অন্য কয়েকজন বন্ধুর সাথে আড্ডা দিচ্ছিল । সন্ধ্যে নাগাদ কাল বৈশাখীর ঝড় শুরু হল , একটু পরে মুষলধারে বৃষ্টিও নামল । সমীরণ ও তার বন্ধুরা দেশী মদের দোকানে ঢুকে দু বোতল মদ ওড়াল । রাত সাড়ে নটা নগদ সেখান থেকে বেরিয়ে দেখল তখনও ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে , বিদ্যুতের চমকানি থেমে গেছে । ভিজে ভিজেই বাড়ির রাস্তা ধরবে কিনা ভাবছিল এমন সময়ে  সমীরণ দেখতে পেল রমলা বাস থেকে নেমে বাড়ির পথ ধরেছে । তার সঙ্গে ছাতা আর টর্চ থাকলেও টর্চের আলোয় তেমন জোর নেই । সমীরণ খানিকটা দূরত্ব রেখে রমলার পিছনে পিছনে চলল ।

নানারকম গাছপালায় ভর্তি অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গার কাছে এসে রমলার টর্চ একেবারে নিভে গেল । সমীরণ বড়বড় পা ফেলে রমলার কাছে এসে পিছন থেকে তাকে জাপটে ধরল । রমলার হাতের ছাতা কোথায় উড়ে গেল , টর্চটাও পড়ে গেল । সমীরণ রমলাকে ধরে জঙ্গলের ভিতরে একটা ভাঙ্গা চালাঘরে নিয়ে তুলল । অন্ধকারে কেউ কারো মুখ দেখতে পাচ্ছিল না বলে রমলা তার আক্রমণকারীকে চিনতে পারল না । রমলা বাঁচাও বাঁচাও করে চিৎকার করল , কিন্তু কাছাকাছি কেউ থাকে না বলে তার ডাক কেউ শুনতে পেল না । সমীরণ অন্ধকারেই রমলাকে চালাঘরের বারান্দায় ফেলে তার উপরে চেপে বসল । রমলা নিজেকে বাঁচানোর প্রাণপণ চেষ্টা করেও বিফল হল এবং শেষে আত্মসমর্পন করল ।

 বেশ কিছুক্ষণ ধরে রমলার উপরে শারীরিক অত্যাচার চালানোর পরে বেহুঁশ রমলাকে সেখানেই ফেলে রেখে সমীরণ পালিয়ে গেল । আরো কিছুক্ষন পরে জ্ঞান ফিরে পেয়ে রমলা কোন রকমে উঠে বসল , তার শাড়ি সায়া  ছিঁড়ে গেছে , জলে কাদায় মাখামাখি হয়ে আছে । শরীরে অসহ্য বেদনা থাকায় আরো কিছুক্ষণ সেভাবেই বসে রইল তারপরে উঠে দাঁড়িয়ে শাড়িটা কোন রকমে জড়িয়ে নিল । বৃষ্টিটা তখন ধরে গেছে । অন্ধকারের মধ্যেই রমলা চালাঘরের বারান্দা থেকে নেমে হাতড়ে হাতড়ে গ্রামের রাস্তার দিকে এগিয়ে চলল । আবছা অন্ধকারে ছাতা বা টর্চ খুঁজে পেল না । ধীর পায়েই সে নিজের বাড়ির দিকে চলল । বাড়ি পৌঁছে সে তার মাকে জানাল অন্ধকারে পা পিছলে রাস্তার ধারে একটা খানায় পড়ে গিয়েছিল ।
 আশপাশের কেউই সে রাতের ঘটনার কথা টের পেল না । সমীরণএর কাজকর্মে ও আচরনে কোন পরিবর্তন দেখা গেল না । রমলা আগের মতোই সহরের নার্সিং হোমএ যাতায়াত করতে লাগল ।

মাস দুয়েক পরে রমলা টের পেল তার গর্ভে সন্তান এসেছে । বয়স ত্রিশ পেরিয়ে গেলেও তার বিয়ে হয়নি এমনকি তার কালো রোগাটে চেহারা দেখে কেউ তার সাথে প্রেম করার চেষ্টাও করেনি বলে এতদিন পর্যন্ত সে কুমারীত্ব বজায় রেখেছিল । ঝড়জলের রাতে অচেনা লোকটি জোর করে তার কুমারীত্ব নষ্ট করায় তার নারী জীবন সার্থক হয়েছে । কিন্তু কুমারী মেয়ে গর্ভ বতী হওয়ার খবর জানাজানি হলে গ্রামে তার ও তার মায়ের বাস করা কঠিন হবে । অতএব তার গর্ভের সন্তানকে নষ্ট করে ফেলা দরকার । নার্সিং হোমএর ডাক্তার নার্সের মাধ্যমে গর্ভপাতের ওষুধ জোগাড় করাও কঠিন হবে না

Tuesday, 9 August 2022

নিশি -- জয়িতা ভট্টাচার্য

নিশি --

জয়িতা ভট্টাচার্য 


দীর্ঘ একটি ক্যাঁচ শব্দে ট্রেনটা দাঁড়িয়ে পড়লো।মনোজ স্টেশনে পা দেওয়ামাত্র আকাশ ফাটিয়ে কাছে একটি বাজ পড়লো।মনোজের হাতে স্যুটকেস আর কাঁধে বড়ো সড়ো একটা ব্যাগ।বাজের সাদা আলোয় ও তুমুল বৃষ্টিতে মনোজ দেখলো বর্ষাতি পরা একটি লোক প্রায় তাকে ধাক্কা দিয়ে ট্রেনে উঠে পড়লো।মাটির প্ল্যাটফর্ম, একটি বুড়ো রোগা লোক গামছা জড়িয়ে এগিয়ে আসছে।মনোজের পেছন দিয়ে ধীর গতিতে চলে যাচ্ছে ট্রেন।সামনে কলাবন আর নানা গাছ ঝোড়ো হাওয়ায় জড়ামড়ি করছে তারই ফাঁকে পলকের জন্য একটি কালচে ছায়ামূর্তি সরে গেলো।মনোজ ভিজে যাচ্ছে।রামশরণ তার হাত থেকে মালপত্র নিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটছে।ডামডিমের নতুন স্টেশন মাস্টার।মনোজ কাক ভিজে অবস্থায় ও অবাক হলো কিছুটা অপমানিত ও।পুরোনো স্টেশন মাস্টার তার কাজ বুঝিয়ে দেওয়া দূরের কথা একটা ভদ্রতা ও করলো না।
দুটি মাত্র ঘর।একটি তার বসবাসের অন্যটি কাজের।ডিমডিমা তে সারাদিনে দুটি ট্রেন পাশ করিয়ে দেওয়ার দ্বায়িত্ব তার।এসব জেনে এসেছে দীর্ঘ দিনের বেকার জীবনে ইতি টেনে।বৃষ্টি র শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না।মনোজ ভিজে জামা পাল্টে নেয়।
রামশরণ কি বোবা?ঠিক তখনই খসখসে গলাটা শুনতে পায়,যেন লম্বা কুঁজো র মধ্যে দিয়ে কেউ বলে উঠলো
----"আমি লাইনম্যান আর এখানে আপুনার রাঁধুনি বেয়ারা আর সব সময়ের সঙ্গী।" কথাগুলো শেষ করে অদ্ভুত ভাঙা গলায় আধো অন্ধকারে হেসে ওঠে রামশরণ।
বৃষ্টি পড়তেই থাকে রাতভর।ঘুম আসে না।সকাল ন টায় আপ ট্রেন।বর্ডার পেরিয়ে আসে।পাশেই পরশি দেশ।কালো ছায়া টা পুরুষের ছিলো না।এত বৃষ্টি র রাতে কে তবে!
মনোজ বসে আছে শালবনে।এখন দুপুর।কিন্তু রোদ্দুর আটকে আছে শালবনের ঘন জঙ্গলে।এছাড়া আমগাছ অজস্র।কলকাতার ছেলে মনোজ জানে না বাকি সব আরো কত গাছের নামগুলো।কত আম।ঝরে পড়ে আছে।গরুতে খায়।সকালের দিকে দূর গ্রাম থেকে দু চারজন আসে তড়িঘড়ি আমি ঝুড়িতে ভরে নিয়ে চলে যায়।মনোজ ওদের সঙ্গে ভাব জমাবার চেষ্টা করে।কিন্তু ওদের চোখে মুখে কী এক আতংক যেন।রামশরণ সারাদিনে দু চারটির বেশি কথা বলে না।মনোজ পাথরের ওপর বসে আছে।ছোটো বেলার কথা মনে পড়ে তার।কলকাতার হৈচৈ আবছা আলোর মতো জেগে ওঠে এই নিঃসীম বনে।প্রায় ঝিমুনি এসে গেছিলো খুটখাট আওয়াজে তন্দ্রা কেটে যায়।পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় মনোজ।একটা ফর্সা ছোট্ট ছেলে।আমি, জাম,পাতা কুড়িয়ে নিচ্ছে।ছোট ছোট দুই হাতের মুঠোয় আঁকছে না।মনোজ কাছে যায়।মুহুর্তে বালক ভয়ে সাদা।---'কী নাম তোমার?কোথায় থাকো।' পায়ে পায়ে পিছু হঠছে।
---"ভয় পেও না খোকা।কাছে এসো"মনোজ নরম করে বলে।
মাথা নাড়ে ছেলেটি।ভয় ভয় আঙুল দেখায় স্টেশনের দিকে।মনোজ বুঝতে পারে ও রামশরণকে ভয় পায়।
সে চলতে থাকে ছেলেটির সঙ্গে।কথা বলে না কেউ ।বিকেল পড়ে আসছে।
লালচে আলো।সামান্য অন্যমনস্ক মনোজ আর গায়েব হয়ে গেল ছেলেটি।মনোজ অনেক দূর পর্যন্ত চলে যায়।একটা নদী।সরু।তিরতির করে বইছে।পাথরের চাঁই।ফাঁকে ফাঁকে নানা রকম বনজ গুলাম,লতা।হাঁপিয়ে যায় মনোজ।কোত্থাও নেই সে।দলে দলে পাখি ঘরে ফিরছে।কলরোল।সন্ধ্যা নেমেছে।কয়েকটি বাদুড় উড়ে গেল প্রায় তার মাথার ওপর দিয়ে। রামশরণের পই পই করে জঙ্গলে ঢোকার নিষেধ ভুলে যায়।
বিরাট একটা চাঁদ উঠেছে।মনোজ বিমূঢ় হয়ে পড়ে। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে চাঁদের দিকে।কী যেন এক আকর্ষণ।নেশা।চারিদিকে মহুয়া গাছ ।মনোজ নিজেকে হারিয়ে ফেলে।
     সিরসির করে হাওয়া দিচ্ছে।শীতল।স্লো মোশনে ঝরে পড়ছে হলুদ শালপাতা।পুরোনো স্মৃতির মতো।এখন সব পরিস্কার দেখা যাচ্ছে চৌদিক।একেই বলে কাক জ্যোত্স্না!
একটা রাতপাখি আচমকা ডেকে উঠলো।মনোজের কেমন অস্বস্তি হয়।তবু সে যেন আটকে গেছে এই জনহীন চরে।মনোজ হঠাৎ চমকে তাকায়।সারা শরীর ঘেমে উঠেছে।ও কি!ও কে ?সরু লিক লিকে একটা আপাদমস্তক কালো ছায়ার মতো নারী শরীর একটা ঝোপ থেকে ছুটে যাচ্ছে আরেক ঝোপে।কয়েক মিনিটে মনোজ একটু ধাতস্থ হয়।চিত্রার্পিতের মতো বসে থাকে।ছায়া নয়।কুচকুচে কালো শরীরটার কোনো ছায়া নেই এই ধপধপে চাঁদের আলোয়।জটা হয়ে যাওয়া দুচার গাছি চুল। কোথাও তাও নেই।একটা জীর্ণ কাপড়ের টুকরো গায়ে মিশে আছে।
মনোজ রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করে।নারীটি নদীতে নেমেছে।ডুবছে।অনেকক্ষণ পর মাথা দেখা যায় শুশুকের মতো।
সেই শিশু টি। যেন মাটি ফুঁড়ে উঠে আসে।একটা ঘড়া খুব যত্ন করে টেনে আনছে।
ছায়াছবি যেন।কালো শরীর বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।চাঁদের আলো ঠিকরে পড়ছে গায়ে।শিশু টিকে দেখা যায় না আর।ঘড়া ভরে জল তুলে হঠাৎ এদিক ওদিক ভীত হরিণী র মতো চাইছে।মনোজ আওয়াজ না করে লুকিয়ে থাকে পাথরের আড়ালে।
এখন মধ্যরাত।ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না র শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না।একখণ্ড মেঘ এসে আড়াল করে চাঁদ।মনোজ সম্বিত ফিরে পায়।প্রাণপণে ছুটছে মনোজ।শালপাতার জঙ্গলে মচ্ মচ্ আওয়াজ হচ্ছে ।অনেক দূর থেকে নাকি সুরে কে যেন তাকে কী বলছে।
            ঘুমের মধ্যে মনোজ অনেক অনেক উঁচু সিঁড়ির ওপর থেকে পা পিছলে পড়ে যাচ্ছে।ধড়মড় করে উঠে বসে।গলা শুকিয়ে কাঠ।কানে ভাসছে একটা খোনা গলা।একটানা নাকি কান্না।বাইরে একটা পাখি দুটো পাখির শিস শোনা যায়।তপ্ত দেহে মনোজ টের পায় ভোর এসেছে।গভীর ঘুমিয়ে পড়ে এবার।নিশ্চিন্তে।
তিনদিন জ্বরে ভুগে কিছু টা কাহিল মনোজ।রামশরণের কাছে তার কৃতজ্ঞতার সীমা নেই।শৈশবের মা হারানো আগাছার মতো বেড়ে ওঠা তার জীবনের এই স্নেহ আর সেবা এক পরম পাওয়া।নতুন জায়গায় আবহাওয়া মানিয়ে নিতে সময় লাগছে।তার ওপর নদীর ঠাণ্ডা হাওয়া সহ্য হয়নি বোধহয় ।
অনেক দূরের গ্রাম থেকে কয়েকটি গ্রামবাসিনী আমি জাম,শুকনো কাঠ কুড়োতে আসে।মনোজের জন্য কখনো মাচার সিমনা,লাউটা দিয়ে যায়। তারা বলে গেলো বাতাস লেগেছে ।শহরের ছেলে সে জানে না বাতাস লেগেছে মানে কী।একটি অল্প বয়সী সপ্রতিভ মেয়ে বুঝিয়ে বলে
---"তোমার খারাপ বাতাস নেগেছে।একবার ওঝা ডাকতি হবেক"
---"মানে?"
---"জঙ্গলে ভুল করে সন্ধ্যা বেলা যেওনি।হুই নদীর ধার থেকে শাকচুন্নিটা বেরিয়ে পড়ে।দেখেছিল আমাদের গেরামের মধু আর সেলিম।তিন মাসের মদ্যি মরি গেল"
ফিসফিস করে জানায় ময়না।
একি ছোটো বেলায় পড়া ভূতের গল্প!ভূত আবার কী।
আচমকা মনে পড়ে যায় এক জ্যোৎস্না ভেজা ঘোর কৃষ্ণা নারীমূর্তি।যেন বহু যুগ আগের এক রাত।শরীর এখনো দুর্বল।ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে।
রাতের ট্রেন চলে যায়।খাবার দিতে আসে রামশরণ।চারটে রুটি সিমভাজা আর ডাল।মনোজ রামশরণকে জিজ্ঞেস করে শাঁকচুন্নির কথা।মাঝে মাঝে রামশরণ বোবা হয়ে থাকে।এখনও চলে যায় নীরবে।
কিছুক্ষণ পর সিগারেট ধরিয়ে মনোজ প্ল্যাটফর্মে আসে।নিঃশব্দ নিশীথ রাত।দূরে আবছা একা একটা মানুষ কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে।কথা বলবে বলে এগিয়ে যায় রামশরণের দিকে কিন্তু কাছে গিয়ে সে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়।রামশরণ কাঁদছে।বার বার মুছে নিচ্ছে তার মলিন গামছা দিয়ে অবিরাম অশ্রুধারা।
ছোটো ছেলেটিকে প্রায়ই দেখা যায় জঙ্গলে ফল কুড়োতে।মনোজ একবার কাছের শহর থেকে ঘুরে এসেছে।কী মনে হতে কিছু চকোলেট একটা বল আর জামা এনেছিল।সন্তর্পণে একটা করে জিনিস লুকিয়ে রেখে এসেছে জঙ্গলে একেক দিন একেক জায়গায়।ফিরে আর পায়নি।এভাবে এক নিঃশব্দ বন্ধুত্ব তৈরী হয় ছেলেটির সঙ্গে ।সে ঘরে আসে না।জঙ্গলের বাইরে আসে না।কথা বলে না কিন্তু হাসে।পালিয়ে যায় না তাকে দেখে।
আরো দুটি গোপন আবিষ্কারের পর মনোজ মনে মনে আবছা আলো দেখে রহস্যের। প্রায় দুপুরে রামশরণ কে খুঁজে পাওয়া যায় না।কোথায় যায় সে এই জনহীন প্রান্তরে !
আরো একদিন মনোজ নিশি অভিযান করে।এবার আরো সাবধানে।
পা টিপে টিপে নিঃসারে পৌঁছে যায় গহীন প্রদেশে।কাস্তের মতো চাঁদ আকাশে।পথ নেই তবু গাছের আড়াল ধরে এগোয় সে।
একটা জীর্ণ কুঁড়ে ঘর।ঝুপুস অন্ধকার যেন জমাট বেঁধে আছে।
হঠাৎ পেছনে খুট করে আওয়াজে পেছন ফিরে স্তব্ধ হয়ে যায় সে।সামনে দাঁড়িয়ে আছে নিকষ কালো একটি মানুষের আকার।বন এখন বোবা।শুধু শ্বাস আর প্রশ্বাসের আওয়াজ।
পা দুটো যেন মাটি তে গেঁথে গেছে মনোজের।
মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে কালীমূর্তি।
কতক্ষণ কেটে গেছে খেয়াল নেই।আস্তে আস্তে লিক লিকে হাত দুটো ওঠে।বিস্ফারিত মনোজ দেখে তার সামনে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে এক মানবী।
"চাঁদপুর এখান হইতে পঞ্চাশ কিমি দূর।মাঝে ঝিলিক নদী।মাঝে বর্ডার।
প্রতিমার বাপ এপারে আসত হরেক মাল নিতে।সেই জংশন এ।ওখানে আলাপ উদয় মুর্মু র সঙ্গে।প্রতিমা তখন চোদ্দ বছর।মেয়ে বড়ো বালাই।তাই বে হয়ে গেল প্রতিমার।ধান মারাই থেকে হেঁসেল সবই করতে হতো।
---"কতদিন আগের কথা কাকা?"
তা প্রায় বছর দশ হবে।তখনও ডামডিম এমন একলা হয়ে যায়নি।
--"কেন?কেন এমন জনহীন হয়ে গেল?"
রামশরণ আপন মনে বলতেই থাকে।উত্তর দেয় না।
এক বছর ওপারে মহামারি হলো।কলেরায় মরলো কত শুনি।
উদয় মরে গেলো।প্রতিমার পেটে বাচ্চা।একটা মেয়ে জন্মে মরে গেছে বিষে।
---"সাপের কামড়ে?"
--তা জানা যায় না।বনের ধারে পড়ে ছিলো মরে। 
--"তারপর?"
প্রতিমার কপাল পুড়লো।খেতে পেত না।রাতে দেওরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে রোগে ভুগে ভুগে একদিন বাপের ঘরে পেলিয়ে এলো।
ছেলেটা বিয়োনোর পর বাপ পরদিনই পাঠিয়ে দিলো শশুরবাড়ি।অত্যাচার চলতে থাকে আবার।নারি শুকোয়নি তখনো।ছেলেটাকে নিয়ে ইমামের দুয়ারে নালিশ করে প্রতিমা।কদিন পর বাজ পড়ে দেওরটা মরে যায় ক্ষেতে।ঘরে একটা সাপ ঢুকে শশুরকে কাটে সেই বর্ষাতেই।এরপর গ্রামে রটে গেলো সে ডাইনি।একদিন ওঝা এসে ঝাঁটা মেরে মেরে ক্ষত বিক্ষত করে দিলো।পরের মাসে গেরামে এট্টা বউ দেখা গেলো গলায় দড়ি দিয়েছ।সে রাতে প্রতিমা ছেলে কোলে ঘুমোয় যে ঘরে আগুন ধরিয়ে দিল গ্রামের লোকেরা।
বাবু,মেয়েছেলে এমনিই বোঝা তায় বিধবা।মরে যাওয়া মঙ্গল।
মনোজ রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করে কাহিনী র তবু আপত্তি না জানিয়ে পারে না।
রামশরণ অন্ধকার করে হাসে।
---"তুমি শহরের লোক বুঝবে কী গো অজ গ্রামে এই বাংলা দেশের মেয়ে ছেলের নিয়তি।এপার ওপার একই"
--"প্রতিমা মরে গেলো!"
মরি গেলে ভালো হতো গো।আধপোড়া প্রতিমা জ্বলতে জ্বলতে ঝাঁপিয়ে পড়ল ঝিলিক নদীতে।
ছেলেটার কথা কেউ জানে না রোগে ভোগা ছেলে জলে ডুবে...মরে গেলো,শেয়ালে নেকড়ে তে ছিঁড়ে খেলো।
ডামডিম এর রাস্তায় এক অমাবস্যা রাতে একটা পেত্নির উৎপাত দেখা দিলো।রাতে এ গাছ সে গাছ এর ওর জানলায় কঙ্কালসার বিকৃত মুখ।ভয়ে কেউ আর বিকেলের পর বেরোত না।উঠোনে রাখা ফলটা চালটা ,মুর্গিটা গায়েব।অনেকে একঝলক দেখেই অজ্ঞান হয়ে গেছে।
গ্রামের শেষ কোণে একাদশী বৈরাগী থাকতো।রাতে তার ছেলে হলো।সে ভয় কাকে বলে জানত না।লোকে বলে একাদশীর ভূত প্রেতের সঙ্গে ওঠা-বসা।মনসুর ফকির এসে থাকতো একাদশীর ঘরে।দুজনে পীড়িত ছিলো।
সকালের ট্রেনে কেউ কেউ দেখেছিল একাদশী ফকিরের হাত ধরে চলে গেছে।আমিও দেখেছি।তবে ছেলেটা ছিলো না।ছেলেটা একাদশীর ঘরেও ছিলো না।এরপর দেশে খুব খরা হলো।ক্ষেত নেই ফসল নেই খাবার ।পেত্নির উপদ্রব,সবাই চলে গেলো গ্রাম ছেড়ে।সব জঙ্গলে ঢেকে গেলো।আমি রইলাম।
এক রাতে সে এলো।কাঠি কাঠি হাত বাড়িয়ে খাবার চাইলো।দিলুম।আমার মেয়েটা মরে গেছিলো তিনদিনের জ্বরে।কোথায় পাবো ডাক্তার।সে বহু কাল আগের কথা।
বউ চলে গেলো 
খবর নেই তারও।ভূত পেত্নি যাই হোক কেমন মায়া হলো।সেই থেকে আমি একটু ...খেই হারিয়ে ফেলে রামশরণ 
---"ও খুব ভালো বাবু কারো ক্ষতি করে না "কাতর হয়ে বলে রামশরণকাকা।
"কিন্তু এখানে স্টেশন মাস্টার টেঁকে না।একটাও লোক নেই।জঙ্গলে ঘেরা জায়গা।জংশন স্টেশনের লোক বলে এখানে ভূত আছে।মেয়েটাকে বারণ করি তবু ক্ষিদের জ্বালায় মাঝে মাঝে রাতের দিকে চলি আসে।
---"ছেলেটা একাদশী বৈরাগীর তাই না কাকা?"
মাথা নীচু করে রামশরণ।ও কথা বলতে পারে না
চোখ মোছে রামশরণ।মনোজ জানলার দিকে চায়।কেন যেন চোখটা জ্বালা করে।
আমি পালাবো না কাকা।কথা দিলাম আমি পালাবো না ওদের ফেলে।তোমার এই মেয়ে কে ফেলে।কথা দিলাম।
রাত এগারোটা।
রাতের ট্রেন আসছে।
পৃথিবীটা সুন্দর লাগছে।অনেক কাজ বাকি।রাতের অন্ধকার চিরে আলোটা এগিয়ে আসছে।নতুন আলো।

অনুভব--ঊশ্রী মন্ডল

অনুভব--
ঊশ্রী মন্ডল

পুরুলিয়ার ঐ লোকগীতিটা এখনও কানে বাজে,

ওরে পুইঙ্কা ভারলি আমায়..
তোর মনে নাই বিবেচনা রে,
ওরে পুইঙ্কা ভারলি আমায়...  l

তখন যে বলিলি পুইঙ্কা ষোলো জোড়া কারা রে..
গাই গরুর লেখা ঝুকা নাই,
এ ছাগলকি ছাগল ভেরি কি ভেরি,
তোর ঘরে আইসা দেখি..
চুইট্টা ইঁদুর নাই রে ;
ওরে পুইঙ্কা ভারলি আমায়.. l 

দক্ষিণ দিকের হাওয়াটা নিলো যে তোর কোঁচাটা..
ঘরে শুইয়া দেখি পুইঙ্কা নীল গগনের তারারে,
ওরে পুইঙ্কা ভারলি আমায়..l

এর অর্থ হলো..
(ওরে পুঙ্কা আমাকে তুই ঠকালি, তখন বলেছিলি অনেক ছাগল ভেড়া আছে, কিন্তু তোর ঘরে এসে দেখি ছোট্ট ইঁদুর পযন্ত নাই l
দক্ষিণ দিকের হাওয়া এসে ধুতির কোঁচা উড়িয়ে নিয়ে গেলো, ঘরে শুয়ে দেখি নীল গগনের তারা, অথাৎ ঘরের চালও ঠিক নাই l)

    বিয়ের আগের মানুষটা বলেছিলো রেডিমেড গার্মেন্টর দোকান আছে, নিজের বাড়ি আছে, জমিজমা আছে, মনের সুখে নাচতে নাচতে মানুষটাকে বিয়ে করে ঘর বেঁধেছিলাম l
ওমা এসে দেখি সব ফুস্..মাটির ঘর, বৃষ্টি পড়লে ছাদ বেয়ে জল পড়ে, আছে বইকি অনেক জমি কিন্তু সবই শাশুড়ির নামে, যবে ওনার ইচ্ছে হবে তবেই ছেলেদের দেবেন  l স্বামীর দোকান ভালোমতো চলে না পুঁজি নেই, ভালো যোগাযোগ নেই, কতবার বললাম, ট্রেড লাইসেন্স কিংবা এক্সচেঞ্জ কার্ড দেখিয়ে ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে ব্যবসা বাড়াও, কিন্তু কানেই নিলো না আমার কথা l আসলে ও একটু ভীরু টাইপের, রিস্ক নিতে ভয় পায় l তা যা হোক, ভুল যখন হয়েই গেছে,আর কিছুই করার নাই, তাই একটু ভালো থাকার চেষ্টা করতে লাগলাম l সংসার বেড়ে উঠেছে খরচাও বেড়ে গেছে অথচ আয় সীমিত,তাই বাধ্য হয়েই দিল্লিতে চলে গেলাম, স্বামী ব্যবসা করার আগের হোটেল সার্ভিস করতেন, সেখানেই যুক্ত হলেন l

              এক চিলতে ঘর আর ছোট্ট রান্নাঘর আর কমন বাথরুম নিয়ে কোনোরকমে দিন কাটাচ্ছি স্বামী ও সন্তানের সঙ্গে l দিল্লিতে থাকার বেশ সমস্যা, ঘরের ভাড়া দিনকের দিন বেড়ে চলেছে, মকান মালিক ইচ্ছে মতো ভাড়া বাড়িয়ে চলেছে, খরচা সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে l কিছু একটা করতে হবে, স্বামীর একলা উপার্জনে ঠিকঠাক চলছেনা, কি করি, কি করি ভাবতে ভাবতে খোঁজ পেলাম সামনেই একটা ফ্যাক্টরী আছে, ফুরণ সিস্টেমে l একটা বড়ো ডাস্টার, তার চারিদিক সিলাই করে দিলে একটাকা করে দেবে, অথাৎ এক ডজনে বারো টাকা, আট ঘন্টা ডিউটি l
                    কিন্তু ঘরে কচি ছেলে, ওকে একা রেখে যাবার উপায় নেই, অগত্যা ছেলেকে বগলদাবা করে নিয়ে চললাম, কারখানার মালিকের কাছে অনুমতি নিয়ে রেখেছিলাম , ছেলেকে সাথে রাখার জন্য, কি ভেবে জানিনা উনি অনুমতি দিয়ে দিয়েছিলেন l একটা ব্যাগে দুধের বোতল, জলের বোতল, বিস্কুট, সামান্য খিচুড়ি , খান কয়েকটা কাঁথা আর জামাপ্যান্ট, কিছু খেলনাও নিয়ে নিলাম l জেগে থাকলে খেলনা নিয়ে গুড্ডু খেলতো, খাবার খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতাম, তারপর লেগে যেতাম কাজে, তা আমি দিনে সব কাজ সামলিয়ে 200 /- টাকার মতো কামিয়ে নিতাম l বিয়ে আগে সেলাই শেখেছিলাম, সেটাই এখন কাজে লাগছে l
                        যেই দেখলো আমি কামাচ্ছি, অমনি বাড়িওয়ালা বাড়িভাড়া বাড়িয়ে দিলো, মনে মনে ভাবলাম এই অন্যায় জড়জুলুম সহ্য করবো না, তাই ঘর চেঞ্জ করে নিলাম l পাশে একটাই পরিবার ভাড়া থাকে, নিশ্চিন্ত হলাম,চারিদিকটা খোলামেলা, বেশ ভালো লাগলো,খুশিতে মনটা বলল, "নে এবার জিতে গেলি l"  পাশের বাড়িতে বাঙালি পরিবার থাকে, স্বামী ও স্ত্রী l বাচ্চা চাইছে কিন্তু শারীরিক ত্রুটির কারণে বাচ্চা হচ্ছেনা,অনেক ব্যবস্থা নিচ্ছে l তা যাইহোক,ওরা আমার ছেলেকে খুব ভালোবাসে l গুড্ডু অনেকটা সময় ওদের কাছেই থাকে l
                       আজ ছুটি পেয়েছি কাজ থেকে, তাই সংসারের সব জমানো কাজ একে একে সেরে ফেললাম, ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছি l এখনও গুড্ডুকে স্নান করাতে হবে খাওয়াতে হবে, ঘুম পাড়াতে হবে, তারপর আমি নিজের জন্য কিছু করতে পারবো l পাশের বাড়ির পলি বলল, "দিদি গুড্ডু আজ আমাদের সঙ্গে খাবে, ওর জন্য রান্না করবেন না, আমিই ওকে স্নান করিয়ে খাইয়ে দেবো, ঘুমও পাড়িয়ে দেবো,ওর জন্য ভাববেন না, আপনি স্নান করে খেয়েদেয়ে একটু বিশ্রাম নিন l আমি এই লোভনীয় প্রস্তাব ঠুকরাতে পারলাম না, তাই ছেলেকে ওর কাছে ছেড়ে নিজের সব কাজ সেরে বিছানায় শুয়ে পড়লাম l
                         যথারীতি চোখ বন্ধ করার পর সেই আগের দিনের মতোই অনুভব করলাম কড়িকাঠ থেকে একটা ফাঁসির দড়ি ঝুলছে, আর কারা যেন আমাকে যেন নিঃশব্দে দেখে চলেছে l আমি চমকে  চোখ খুলে দেখি, কেও কোত্থাও নেই, মনে মনে ভাবি এইগুলি বোধহয় আমার ভ্রম, অত্যাধিক কাজের চাপ বেড়ে গেছে বোধহয় l
                 আজকেও সেই একই অবস্থা, তবে দেখি বিছানায় একটা টুল, তাতে ঐ নিঃশব্দে দেখা লোকগুলো আমাকে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে টুলে দাড় করিয়ে ঐ ফাঁসির দড়িটা আমার গলায় পরিয়ে দিচ্ছে , আমি কোনোমতেই গলায় পড়তে চাইছিনা, তবুও ওরা জড়জবরদস্তি করে পরিয়ে দিলো , কাকুতি মিনতি করে বললাম, আমায় ছেড়ে দাও, আমার ছোট্ট সন্তান আছে, কিন্তু কে কার কথা শোনে.. ওরা আমার কথা কানেই নিচ্ছেনা, প্রাণপনে চিৎকার করে উঠলাম, তোমরা কে কোথায় আছো গো,বাঁচাও আমাকে বাঁচাও l

                           একটু পড়ে  শুনতে পেলাম, গুড্ডু তারস্বরে কাঁদছে, চোখ মেলে দেখলাম, ঘরে অনেক লোক, পলি আমার চোখে মুখে জল দিচ্ছে l আমি শশব্যস্তে উঠে বসে, ছেলেকে কোলে টেনে নিলাম l
দেখলাম সকলের চোখেই অনেক জিজ্ঞাসা..
কি উত্তর দেবো.. আমিই তো কিছুই জানিনা l
পলি বলে, আপনার চিৎকার শুনে, ঘরে এসে দেখি আপনি গলায় দড়ি দিয়েছেন, আমরা সকলে মিলে কোনো রকমে আপনাকে ঐ ফাঁসি থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছি, কেন দিদি,কেন এমন করলেন.. প্লিজ খুলে বলুন আমাদের, কোনো সমস্যা থাকলে তা সমাধানের জন্য আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করবো l আপনার একটা কচি সন্তান আছে,
 ভালোমানুষ একটা স্বামী আছে, তাঁদের ছেড়ে কোথায় যাচ্ছিলেন আর কেনই বা মৃত্যুকে বরণ করছিলেন , এতো ভীরু তো নন আপনি, প্লিজ সব খুলে বলুন l
                 আমি ওদের বললাম, কোন দুঃখ্যে আমি মরতে যাবো, এরাই তো আমার সব | ওরাই তো জড়জবরদস্তি আমাকে দড়িতে ঝুলিয়ে দিলো, আমি তো চাইনি l সবাই আমাকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে দেখতে লাগলো, বলল কোথায়, কারা এই অবস্থায় তোমায় এনেছে, কাউকেই তো দেখতে পাচ্ছিনা ?
                সবাই আমাকে পাগল ভাবছে, আমার কথা কেও বিশ্বাস করছেনা,আড়ালে আবডালে আমার ভরপুর নিন্দা করতে লাগলো, আমি কোণঠাসা হয়ে পড়লাম l মানুষের সাথে চোখ তুলে কথা বলতে পারিনা, অথচ চোখ বুঝলেই তাঁদের দেখতে পেতাম, তারা এখন মুচকি মুচকি হাসে l আমি ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়তে লাগলাম  l স্বামীকে বললাম, ঘর দেখো, এ ঘর চেঞ্জ করতে হবে, অবশেষে একটা ঘর দেখে চলে এলাম l  কয়েকদিন পড় শুনলাম, ঐ ঘরে একটি পরিবার ভাড়া এসেছিলো, ঐ পরিবারের বৌটিকে পরিবারের সকলে মিলে গলায় ফাঁস লাগিয়ে মেরে ফেলে, তারপর ঐ পরিবারের লোকজন কেন জানিনা,কি ভাবে সবাই এককাট্টা মারা যায় l এরপর থেকে ঐ ঘরে কেও থাকতো না, তালা মারাই থাকতো l আমি কম পয়সার ঘরের লোভে কোনো খোঁজখবর না নিয়েই ঐ ঘরে বাস করতে গিয়েছিলাম l তাই আমার এই পরিণতি হয়েছিল l
স্বামী ও সন্তান নিয়ে এখন ভালো আছি, আর কোনো অস্বাভাবিক কিছুই দেখি না l তবে ঐ স্মৃতি মাঝে মাঝেই আমাকে বড়োই জ্বালায়, এর থেকে ছুটকারা পাবার কোনো উপায় আছে কি ? আপনাদের যদি জানা থাকে তাহলে আমাকে জানাবেন কেমন.. প্লিজ  l

পলাশের রঙ--সাবিত্রী দাস

পলাশের রঙ--
সাবিত্রী দাস
             

আমাদের গতানুগতিক জীবন-যাপনের মাঝে কখনো কখনো সহসাই এসে পড়ে কোন একটা অন্য রকম দিন যেদিনটি বিশেষ ভাবে চিহ্ন রেখে যায় মনের কোণে,গভীরে গোপনে।সেদিনটি কখনো হয়তো চোখের জলে  ফ্যাকাশে হয়ে ওঠা,নয়তো আবার নিরেট অশ্রুবিন্দুর মুক্তো হয়ে রয়ে যায় হৃদয় -অলিন্দে ।সেই অমলিন স্মৃতিটুকু ঝাপসা হয়না কোনদিনই।
  তখন  পড়তাম কলেজে।আসা যাওয়ার পথ টুকু আমরা তিন বন্ধুনী মিলে গল্প করতে করতে পেরিয়ে যেতাম অনায়াসেই।তখন  মার্চ মাসের প্রথম দিকের কথা,আমরা তিনজন  নিজেদের মতো করে হাঁটছিলাম কলেজের পথে।দেখি আসছে রতন,খানিক অপরিণত মস্তিষ্কের বলেই  হয়তো সবাই ডাকতো রতা -পাগলা।
বাঁ হাতখানি পিছনে কিছু যেন লুকিয়ে রেখেছে।কাছে এসে হাত বাড়িয়ে দেখায় একমুঠো রক্ত পলাশ । আমাদের  সবার দিকে তাকিয়ে হাসছে মিটিমিটি। আচমকা আমার হাত ধরে হাতের মধ্যে গুঁজে দিল সেই মুঠোভর্তি রক্ত-পলাশ।ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে গেলেও ,হেসে উঠেছি রতনের কান্ড দেখে।আমাদের হাসতে দেখে ওতো ভীষন খুশী!হাসতে হাসতে  লাফাতে লাফাতে একেবারে দৌড়। যেতে যেতে আরও  দু একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল আমাদের দিকে।পাগলের কান্ড দেখে সবাই  অবাক! খানিক হাসাহাসি  ও চলল বৈকি!
   রতনরা এখানের পুরানো বাসিন্দা নয়, ভাড়া এসেছে বছর দেড়েক আগে।তাই ওর এই অবস্থা জন্মগত নাকি অন্য কারন তাও  আমাদের জানা ছিল না।
 বছর কুড়ি একুশের যুবক অথচ অপাপবিদ্ধ সারল্যে মাখা  চোখ দুটি  সর্বদাই মিষ্টি হাসিতে উদ্ভাসিত। সেই নিষ্পাপ মুখের অমলিন হাসিটুকু আজও চোখ বন্ধ করলে স্পষ্ট দেখতে পাই।চোখ খুললেই তো একবুক দীর্ঘশ্বাস বুক খালি করে বেরিয়ে আসে।
 আমার কিশোরী মনের আঙিনার সবটুকু সেদিন রাঙা হয়ে উঠেছিল এক মুঠো পলাশের রঙে।সে রঙ সহস্র ধারায় ছড়িয়ে পড়েছিল রন্ধ্রে রন্ধ্রে,দেহের প্রতিটি তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে। সেই রক্তিম পলাশের  সঙ্গে প্রথম বসন্তের আহ্বান আজও  ভুলতে পারলাম না।
  কালের প্রবাহে আজ রতন কোথায় আমার  জানা নেই,কিন্তু তার পলাশ যে আজও আমার বুকের ভেতর রয়ে গেছে ঠিক তেমন ই। রঙে রসে সুষমা ছড়িয়ে যায় প্রতি নিয়ত।

একটি ব্যর্থ প্রেমের গল্প-- শ্যামল মুখার্জী

একটি ব্যর্থ প্রেমের গল্প
শ্যামল মুখার্জী

প্রায় চললিশ বছর পর আমার নিজের গ্রামে ফেরার সুযোগটা হঠাৎ কেমন করে যেন এসে গেল। জন্ম হবার পর প্রায় উনিশ বছর এখানে কাটিয়েছি। চাকরি আর সংসার জীবনে ঢুকে এখন প্রবাসী, দেশে ফেরার আর উপায় নেই, ইচ্ছে থাকলেও, তবু জন্মভূমিকে এক মুহূর্তের জন্য ভুলতে পারিনি। প্রবল ইচ্ছা হলেও তারপর থেকে একবারের জন্য গ্রামে আসার সুযোগ ঘটেনি এর মধ্যে। পৌঁছানোর পর কাল বিলম্ব না করে একা একাই বেরিয়ে পরে ঘুরতে থাকলাম পাড়াময়, বাজারের গলিতে আর আমার স্কুলের চারধারে পাগলের মত, আমার হারিয়ে যাওয়া শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে।

ক্রমাগত হাঁটতে হাঁটতে দেহে ক্লান্তি এলেও মানসিক ক্লান্তি ছিল না। চারদিকের দৃশ্য আমার চোখের আর মনের খিদে বাড়িয়ে তুলছিল। তবু বাজারে ঢুকে এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে পড়লাম। পুরো মানচিত্রটাই পাল্টে গেছে, ছেলে বেলায় আমাদের গ্রামের বাজারে হাতে গোনা মাত্র চার পাঁচটাই দোকান ছিল আর এখন সেখানে একটা সম্পূর্ণ বাজার বসে গেছে। প্রায় সব কিছুরই দোকান হয়েছে আর ভিড়ও বেড়েছে, সেই অনুপাতে। এত পরিবর্তন হয়ে গেছে কালচক্রে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাই ভাবছিলাম। এদিক ওদিক দেখতে দেখতে হঠাৎই বাজারের মাঝখানে সেই পুরনো কালী মন্দিরটার পাশের দেওয়াল ঘেঁষে চাতালে বসে থাকা এক আধ বয়সী মহিলার দিকে চোখ পড়ল। লাল পাড় শাড়ি পরা, কপালে বড় করে সিঁদুরের টিপ, কেমন যেন চোখ বড় বড় করে উদ্ভ্রান্ত আমাকে দেখে যাচ্ছেন। কেমন যেন অপ্রকৃতিস্থ। এমনভাবে একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন কেন? নিজের মনে জিজ্ঞাসা করলাম। আমিও ওকে দেখে যাচ্ছিলাম। এমন ভাবে একজন মহিলার দিকে তাকিয়ে থাকাটা অন্যায় ভেবেও চোখ ফেরাতে পারছিলাম না কিছুতেই। ওকে দেখতে দেখতে হঠাৎ মানস পটে ভেসে উঠলো অনেক কাল আগে হারিয়ে যাওয়া একটা সরল আর কচি মুখ। আরে মৃণালিনী না? হ্যাঁ, তাইত। সেই মুখটাই তো। এখন অনেক মিল থাকলেও পোড় খাওয়া--বার্ধক্যের রূপ নিয়েছে। অপলক তাকিয়ে থাকতে থাকতে সিনেমার গল্পের ফ্ল্যাশ ব্যকের মত আমার চৈতন্য জুড়ে এক ঝাঁক পুরনো স্মৃতি ভেসে উঠলো….মনে পড়ে গেল আমার বিগত জীবনের অনেক অব্যক্ত কথা, অনেক ঘটনা, আমার হারিয়ে যাওয়া প্রথম যৌবনের প্রেম। হ্যাঁ একেই তো আমি একদিন মন -প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিলাম।
তখন আমার বয়স মাত্র ষোল কি সতেরো। মেট্রিক পরীক্ষা পাস করে সবে কলেজে ভর্তি হয়েছি। বন্ধুদের সাথে এক বিকেলে রথের মেলায় গেছি। সদ্য-প্রাপ্ত তরুণ হৃদয়। বন্ধুদের সাথে এটা ওটা কিনে খাচ্ছিলাম। আর মেলার ভিড়ে অবচেতন মনে অজান্তেই হয়তো কোন তরুণী হৃদয়ের সান্নিধ্য খুঁজছিলাম। যেটা এই বয়সন্ধি ক্ষণে প্রায়ই ঘটে। বন্ধুরা টেনে নিয়ে গেল নাগর দোলায় চড়তে। নাগরদোলায় বসে উপরে উঠার সময় আমাদের সামনের দোলনায় বসে থাকা সাদা ফ্রক পরা একটি চোদ্দ- পনে বছরের শ্যামলা রঙের সাদা-মাটা অথচ বেশ হাসিমাখা মুখের কিশোরীর দিকে চোখ পড়ল। ঠিক আজকের মত লাজুক মুখে আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। ব্যাস এই চাহনিই আমার কাল হল। প্রচন্ড ভয় হচ্ছিল আমার অথচ আমরা দুজন দুজনকে আর সবার দৃষ্টিকে বাঁচিয়ে দেখে যাচ্ছিলাম একভাবে। প্রথম প্রেমের অনুভূতি, মনে হচ্ছিল নাগরদোলা টা ঘুরেই চলুক অনন্তকাল ধরে ঠিক একইভাবে। 
সন্ধ্যে হয়ে আসছিল। বাড়ি ফিরতে হবে কারণ মায়ের বকা শোনার ভয় আমার তখনও ছিল। কিন্তু মন চাইছিল না কিছুতেই ওকে ছেড়ে চলে আসতে। বন্ধুরা কেউ লক্ষ্য করেনি ব্যাপারটা। ক্ষুন্ন মনে বাড়ি ফিরছিলাম ওদের সাথে, হঠাৎ শুনতে পেলাম পেছনে কারও প্রাণখোলা মিষ্টি হাসির শব্দ। পেছনে তাকিয়ে দেখি--যাকে কল্পনা করে যাচ্ছিলাম ঠিক সেই। হয়ত আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই শুধু ওর বন্ধুদের সাথে অকারণ এই হাসি। আমার প্রথম প্রেম। বুকের মধ্যে একতাল রক্ত যেন ঝোলকে উঠেছিল লজ্জা, আনন্দ আর ভয়ের মিশ্রিত অনুভূতিতে। তারপর থেকে প্রায় বছর খানেক ধরে চলেছিল আমাদের নিবিড় আর নিঃশব্দ প্রেমের মহড়া। আমার কলেজে যাবার, বাজারে যাবার সময়গুলোকে লক্ষ্য করে ও ঠিক দাঁড়িয়ে থাকতো প্রতিদিন আমার প্রতীক্ষায়। আর আমিও ওর স্কুল থেকে ফেরার সময়টাকে আমার কলেজ থেকে ফেরার সময়ের সাথে মিলিয়ে নিতাম। কিন্তু আমি আর ও দুজনেই নিজেদের বন্ধু বান্ধবীদের ভিড়ের মাঝে পাশাপাশি হাঁটলেও ভয়ে আর লজ্জাতে কেউ কাউকে মুখ ফুটে বলতে পারিনি। লোক লজ্জা আর ভয় আমাদের দুজনকেই দূরে সরিয়ে রাখছিল। আর বলবোই বা কি করে--প্রেমের ভাষা ওই কচি বয়সে আমাদের জানা ছিল না। শুধু অনুভূতি ছিল, ভাষা ছিল না, তারপর একদিন এসেছিল সেই পরম আকাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটা। আমার কলেজ ছুটি ছিল সেই দিন। বিকেল বেলায় মায়ের ফরমাসে বাজার করে ফিরছি। নিজে অজান্তেই আমি নিজের বাড়ির রাস্তায় না গিয়ে ওদের বাড়ির দিকের ঘোরা পথে রওনা হলাম। মনে হয়েছিল ও তো ঠিক জানে আমি কোন সময় বাজার থেকে ফিরি। যদি দেখা হয়ে যায়। কিছুটা এগোতেই প্রচন্ড মুষলধারায় বৃষ্টি নামলো। ভাবলাম এত বৃষ্টিতে ও আর ঘর থেকে বেরোতে পারবে না। রাস্তায় একটাও লোক ছিল না এত বৃষ্টিতে। কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না বৃষ্টির ধোঁয়ায়। কিন্তু একি! ওই তো সেই সাদা ফ্রক পরা আমার মানসী দাঁড়িয়ে আছে ঠায় রাস্তার পাশে... আমার অপেক্ষায়। এত বৃষ্টি মাথায় করে ঠকঠক করে কাপছিল ও ঠান্ডায়। এত দিন কোন রকম চলে যাচ্ছিল একটু দেখতে পাবার আর অপ্রকাশিতও প্রেমের অনুভূতির খুশিতে কিন্তু এবার ? এত কাছে আর এক্কেবারে একা। কি বলবো ওকে? ভয়ে আর এক বুক উৎকণ্ঠায় হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ও এগিয়ে এলো আমার দিকে।
কিন্তু কিছু বলতে না পেরে হঠাৎ আমার হাতটা নিজের মুঠোর মধ্যে নিয়ে গুমড়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। আমিও হৃদয়ের আবেগকে কোন মত সংযত করে শুধু বলতে পেরেছিলাম-- '' কেঁদো না... চুপ কর... চুপ কর... কেউ দেখে ফেললে কি হবে বলতো? চলো তোমায় আমি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি... ইস বৃষ্টিতে একেবারে চুপসে গেছো'' ও কিন্তু কেঁদেই চলেছিল। আমি উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম সেদিন। হয়তো ওর সদ্য যুবতী হৃদয়ে আমার জন্য যে প্রেমের বন্যা বইছিল, তা বাকরুদ্ধ হয়ে শুধু অশ্রুধারা হয়ে নেমে আসছিল ওর চোখ থেকে। তারপর আরো পাঁচ - ছ বার ওর সাথে নিবিড় হতে পেরেছিলাম কিন্তু আমাদের কারো মুখে প্রেমের কোন ভাষার যোগান হয়নি। শুধু ''কেমন আছো ? আজ স্কুলে যাওনি?'' অথবা ''তোমার মা কেমন আছেন?'' এই সব অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তাই হয়েছিল। আমরা দুজন দুজনকে ভালবাসতে বা ভালোবাসার কথা বলতে কোনদিন পারিনি। শুধু দেখা হওয়ার ভালো লাগাটাকেই নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করতে পারতাম আমরা। হয়তো দুজনই দুজনকে ভালোবাসতে শুরু করেছিলাম কিন্তু মুখ ফুটে কেউ কাউকে কিছু বলতে পারিনি।
আর দেখা হয়নি ওর সাথে। গরিব ঘরের ছেলে আমি। সংসারের ভরণ পোষণের দায়িত্ব নিয়ে পড়াশোনা ছেড়ে চাকরির খোঁজে বিদেশে পাড়ি দিতে হয়েছিল। তারপর পেরিয়ে গেছে অনেক বসন্ত। আমি এখন বিয়ে-থা করে ছেলেপুলে নিয়ে পুরোদস্তুর সংসারী। হয়তো মৃণালিনীও তাই। জীবনে চলার গতির মাঝে ওকে মনে পড়েছে বহুবার কিন্তু দেখা করার আর সুযোগও হয়নি আর সাহসেও কুলায়নি।
আজ বহুদিন পর দুজন দুজনকে এত কাছে পেয়েও কেউ কাউকে বলতে পারলাম না,''আমি তোমাকে প্রাণ থেকে ভালোবেসে ছিলাম।'' শুধু আমার দেখা হওয়ার ভালো লাগাটাকে প্রাণ দিয়ে উপলব্ধি করে দুজনেই আমরা পেছনে তাকাতে তাকাতে সামনে এগিয়ে গেলাম। 
সমাপ্ত

স্বপ্ন ঘর--সান্ত্বনা চ্যাটার্জি

স্বপ্ন ঘর--

সান্ত্বনা চ্যাটার্জি


সামনেই হাওয়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা।আমি একতলার কাকাবাবুর ল্যাবে বসে অঙ্ক করছিলাম। রাত বারটাবেজে গেছে, কাকাবাবু শুতে চলে গেছেন।যাবার আগে মাথায় এক চাঁটি  মেরে বলে গেছেন সব কটা অঙ্ক শেষকরে শুতে যাবি।ডিসেম্বরের রাত, হাড কাঁপান শীত পরেছে। আমি সোয়েটারের ওপর চাদর মুরি দিয়ে অংককরছি হঠাৎ মনে হল কে যেন আমার চুলে আঙুল দিয়ে বিলি  কাটছে।চমকে পিছন ফিরে দেখি একটা নয় দশবছরের মেয়ে পিছনে দাঁডিয়ে।
এ্যায় কে রে তুই। এতো রাতে এখানে কি করছিস?
মেয়েটা ঠোঁট উল্টে বলল এ আবার কি আমাকে চিনতে পারছিস না? আমি তো তোর রমাদি।
ইয়ার্কি হচ্ছে !ও রামুকাকা এখানে এসো তো, দেখ কে এই মেয়েটা। 
ঘুমন্ত ঢুলু  ঢুলু চোখে রামুকাকা এসে হাজির। কি হয়েছে খোকাবাবু এত রাতে ডাকা ডাকি করছ কেন।
ডাকছি কি আর সাধে, দেখো না এ মেয়েটা কার মেয়ে, বড় বিরক্ত করছে।
কোন মেয়ে আবার।
পিছন ফিরে দেখি খুকি হাওয়া। কি আশ্চর্য, গেল কোই।
ও পালিয়েছে ভয়ে। আসলে বাবু তো কত আত্মীয় স্বজন কে আশ্রয় দিয়েছেন। 
রামুকাকা চলে গেল।
মেয়েটাকে কোথাও দেখেছি মনে হল। কিন্তু তা কি করে হয় ।
রমাদি কে শেষ দেখেছি তখন তার বয়স বারো।আমার থেকে দু বছরের বড় , তার মানে এখন বয়স আঠের- উনিশ। 

,আমি স্বপ্ন ঘরে তো যাই নি এখনো, তাছাড়া সে ঠিকানা তো রমাদি জানেই না। 
যখন শহরের বিষাক্ত হাওয়া দম বন্ধকরে দেয় তখন আমি আমার স্বপ্নঘরে চলে যাই।
এ ঘরটা আমাদের ছাতে বানিয়েছি, এখানে নেই কলরব ,নেই রাগ ,নেই কোনও অভাব, এ ঘর শান্তির ঘর, আগল ভাংগা, খোলা নীল আকাশ, আকাশ ভরা তারা।
আমার সেই স্বপ্ন ঘরের ঠিকানা বেশী কেউ জানে না ।আমি ল্যাব থেকে বেরিয়ে সিঁডি বেয়ে ছাতে গেলাম।আমার স্বপ্ন ঘর আমি যে কোনও বাড়ির ছাতে নিয়ে যেতে পারি।
ছাতের দরজা খুলে আমি অবাক, অনেকেই তো অনাহুত চলে এসেছে। ছোটো মেয়েটা, মানে ছোটোবেলাররমাদি, মামার ছেলে সত্যেন, পিসির বাড়ির কাজের ছেলে হরিপদ আর ও কিছু ছায়া ছায়া মানুষ চিনতেপারলাম না। 
বললাম একি এখানে তো চাঁদের হাট, হঠাৎ কি ব্যাপার ।
মন্টু (আমার স্কুলের বন্ধু) বলল একটা কান্ড হয়ে গেছে।
কি কান্ড?
পরীক্ষার প্রশ্ন পত্র ফাঁস হয়ে গেছে।
কোন পরীক্ষা!
অঙ্ক !
সে কি, তুই জানলি কি করে?
তোর তো জানার কথা।
কি ?
তোর কাকাবাবু তো এবারের অঙ্ক প্রশ্ন পত্র তৈরী করেছেন।
আমি তো তা ঘুনাক্ষরেও জানতে পারিনি- আমার মুখ টা হাঁ হয়ে ঝুলে পরেছে।
আরে বাবা এখন তো জানলি , এখন আর ক্যাচাল না করে প্রস্নপত্রের অঙ্ক সব কাকাবাবুর কাছে করিয়ে নিস।
কোন প্রশ্ন পত্র ?
আরে বাবা প্রশ্নপত্র তোর কাকাবাবুর ল্যাবে রেখে এসেছে রমাদি, তুই গিয়ে খাতায় তুলে নে। আমরা আবারকাল আসব।
স্বপ্ন ভাঙ্গা মধ্যরাতে আমার কানে যেন মধু বর্ষণ।
হঠাৎ মাথার উপর কি যেন পড়ল ঠান্ডা শিরশিরে কানে এল আওয়াজ টিক টিক টিক টিক।
আমি তো চমকে চোদ্দ।
রাত আড়াইটা বাজে।
আমি কাকাবাবুর ল্যাবেই চেয়ারে বসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। দেখলাম একটা ঘিনঘিনে টিকটিকি মাথার থেকেনেমে টেবিলের তলায় ঢুকল। আমি খোলা অঙ্কের খাতায় দেখলাম কাকাবাবুর দেওয়া একটা অঙ্ক যেটা কিনাআমি কিছুতেই সমাধান করতে পারছিলাম না।
আমি টেনিদার স্টাইলে চেঁচিয়ে উঠলাম ইউরেকা; স্বপ্ন ঘর যুগ যুগ জিও।

Monday, 8 August 2022

কালো রঙের চাঁদ-- তৈমুর খান

কালো রঙের চাঁদ-- 
তৈমুর খান 

এক. 

নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে দু ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। অন্তরটা মোচড় দিয়ে উঠল। প্রায় দশ বছর হয়ে গেল এতটুকু চিড় ধরেনি মনে। নানা কাজে ভুলে গেছি হয়তো। সাংসারিক জটিলতা আর টানাপোড়েনে বিধ্বস্ত হয়েছি। কিন্তু যখনই একা হয়ে গেছি, যখনই নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি তখনই মনে পড়েছে ওকে। ওই আমার প্রথম নির্বাচিত নারী। যাকে আমি আমার জীবনের সঙ্গী করতে চেয়েছিলাম। 
উচ্চ শিক্ষা লাভ করেও যখন চাকুরি পাচ্ছি না, শুধু টিউশানই একমাত্র ভরসা, তখন কোন্ মেয়ের বাপ আমার সঙ্গে তার মেয়ের বিয়ে দেবে? সুতরাং বিয়ে করার ভাবনা মাথাতেই আসেনি। কোনও রকম দিন কেটে যাচ্ছে। কোথাও ঝিলিক দিচ্ছে নারীমুখ ।জ্যোৎস্না রাত হাতছানিও দিচ্ছে না তা নয়। মধ্যরাতে ঘুমও ভেঙে যাচ্ছে । স্বপ্নের ভেতর কখনও কখনও ছাত্রীরাও উঁকি মারছে। তা মারুক, কেউকেই বেশি প্রশ্রয় দিতে পারছি না। এমন সময়ই কাগজের বিজ্ঞাপন দেখে দরখাস্ত করি আর জুটে যায় একটা কলেজের আংশিক শিক্ষকের চাকুরি। একে কি চাকুরি বলে! নিজেরই সন্দেহ হয়। মাস গেলে দেড় হাজার টাকা। তা হোক, টিউশানের বাজার বাড়তে থাকে। আয়ও প্রায় পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যায়। 
দিব্যি একটা সংসার চলবে, তুই বিয়ে কর! চা খেতে খেতে এক হাতুড়ে ডাক্তার বন্ধু পরামর্শ দেয়। নিজেও ভাবতে থাকি বয়স প্রায় তিরিশে পা দিতে চলেছে। এ সময় তো বিয়ে করা জরুরি বইকি! ভাবতে ভাবতে বলি, কিন্তু কাকে বিয়ে করব? 
বন্ধুটি দ্রুত উত্তর দেয়, আমারই মামা শ্বশুরের মেয়ে আছে, নোনাডাঙা বাড়ি। এবছরই বি এ পাস করেছে। আমাকে বর খুঁজতে বলেছে। আগামি রবিবারই চল্, দেখে আসি। 
সম্মতি না দিয়ে পারিনি। একটা বয়সে বিয়ে করার ইচ্ছা সব নারী-পুরুষেরই থাকে। আমারও ছিল। একটা বি এ পাস মেয়ে, দেখতে ভালো হলে এবং আমাদের সাধারণ নিম্নবিত্ত পরিবারে মানিয়ে নিলে বিয়ে করতে আপত্তি কোথায়? 
কিন্তু সেই সপ্তাহে রবিবার দিনটি আসতে বড়োই দেরি করছে আমার মনে হল। প্রতিদিনই বারের হিসেব করি আর রাত দীর্ঘ হয়ে যায়। অবশেষে বহু নির্ঘুম রাত আর প্রতীক্ষার পর কাঙ্ক্ষিত রবিবারটি এসে উপস্থিত হল। বুঝতে পারলাম, বাসনা তীব্র হলে সময় তখন দীর্ঘ মনে হয়। মুহূর্তগুলিও বছরে পরিণত হয়ে যেতে পারে। 
সকাল সকাল স্নান করে বেরিয়ে পড়লাম চুপচাপ। বন্ধুটিকে সঙ্গে নিতে হবে। ওরই পরামর্শ ছিল, কাউকে জানানোর দরকার নেই, আগে পছন্দ হোক, তারপর কথাবার্তা। বাড়ির লোকও জানবে না। 
বাসে করে যাচ্ছি। সমস্ত রাস্তা কত রকম চিন্তা এসে ধাক্কা দিচ্ছে। কী জিজ্ঞেস করব? হ্যাঁ, কোন্ বিষয় নিয়ে পড়াশোনা, ইসলাম সম্পর্কে কেমন ধারণা, সংসারে মানিয়ে নেবার ক্ষমতা আছে কিনা ইত্যাদি। কখনও আবার মনে আসছে, কী হবে ওসব জিজ্ঞেস করে? বরং মেয়েটি দেখতে কেমন হবে, কাজ করার ক্ষমতা আছে কিনা, সহিষ্ণু কিনা ইত্যাদি। বাস ছুটছে, যেন আমরা যুদ্ধ জয় করতে যাচ্ছি। তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে সেই রাজকন্যাকে উদ্ধার করতে যাচ্ছি। কী আনন্দ! মনপ্রাণ যে নাচছে, কিন্তু কেউ দেখতে পাচ্ছে না। হাওয়া এসে চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। বারবার কল্পনায় দেখে নিচ্ছি মেয়েটির চোখ। কী উজ্জ্বল! কী স্নিগ্ধ! কী বিস্ময়! 

দুই. 

যথারীতি খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে মেয়েটিকে আনা হল আমাদের সামনে। না, সাজপোশাকের কোনও বালাই নেই। যে শাড়িটি পরে সে এখানে ওখানে বের হয় কোনও অনুষ্ঠানে, সেই শাড়িটিই পরে এসে উপস্থিত হল। সকালের রোদ রং শাড়ি। অপূর্ব মানিয়েছে। সাদা সাদা বেলফুলের ছাপ সমস্ত শাড়ি জুড়ে। আরও পবিত্র ও স্নিগ্ধ করে তুলেছে ওকে। সামনে দাঁড়িয়েই সকলকে সালাম জানাল। যথারীতি সালামের উত্তরও দিলাম। তারপর বললাম, বসুন! 
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর করল, আমাকে "তুমি" বলুন। 
বেশ, তাই হবে। তারপর মুখ তুলে তাকাল। 
মুখটি খুব সুন্দর নয়, কিন্তু বড়ো সরল ও সতেজ মনে হল। নাকের নিচে ঠোঁটের বাঁ দিকে একটা কালো তিল, কালো রঙের চাঁদের মতো চনমন করছে দেখলাম। শ্যামবর্ণ ঠোঁটের লাল আভা অস্ফুট পদ্মের লাল পাপড়ির মতো। কপালের এক গোছা চুল যেন স্থির তরঙ্গের মতো। মুখটি গোল হতে হতে শেষ পর্যন্ত আর গোল হয়নি। আঁটসাঁট শরীরের সঙ্গে বেশ মানানসই। বন্ধুটি বলেছিল, ভালো ছেলে খুঁজছে, চাকুরি না হলেও হবে। ওর বাপের যা আছে তাতে বহু বড়োলোক জামাই ও পাবে। কিন্তু তা দেবে না। সৎ, শিক্ষিত ভালো ছেলে হলেই হবে। 
আমি এই তথাকথিত ভালো ছেলের পর্যায়ে পড়ি কিনা সে কথাই ভাবছিলাম বারবার আর ভাবতে ভাবতেই প্রশ্ন-উত্তর পর্ব শুরু হয়েছিল। 
—তোমার নাম কী? 
—খালিদা রহমান। 
—পিতার নাম? 
—হাফিজুর রহমান। 
—কত দূর লেখাপড়া করেছ? 
—বি এ পাস। 
—কী কী বিষয় ছিল? 
—বাংলা, ইতিহাস, দর্শন। 
—কোন্ বিষয় পড়তে ভালো লাগে? 
—বাংলা। 
—আচ্ছা, একটা খুব অপ্রিয় কথা জানতে চাই, আমি তো চাকুরি করি না, টিউশান করি আর কলেজের আংশিক শিক্ষক, খুব সামান্য আয় করি। তুমি সব মানিয়ে নিতে পারবে তো? 
এবার খালিদা মাথা নামিয়ে দেয়। এতক্ষণ যত দ্রুত উত্তর দিচ্ছিল এবার যেন থেমে যায়। আবার তাড়া দিয়ে বলি, বলো, কী হল? 
মাথা ঝুঁকিয়ে সে নীরবে সম্মতি জানায়। 
আমার পাশে থাকা বন্ধুটি বলতে থাকে, তা হলে যাও এবার। 
ওকে থামিয়েই বলি, না থামো, এদিক ওদিক তাকিয়ে খুব নিচু গলায় খালিদার কাছে জানতে চাই, আমাকে তোমার পছন্দ তো? 
এবার জোরে হেসে ওঠে খালিদা, চোখের ভেতর চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি চালনা করে দেয় আর এক ছুটে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি কিছুক্ষণ। এতগুলো প্রশ্ন-উত্তর চলেছে, তার ফাঁকে খুঁটে খুঁটে দেখেছি খালিদাকে। বাঁশঝাড়ে ঘেরা তাদের গ্রাম্য মাটির বাড়িতে এক মনোরম আনন্দ আমাকে সর্বদা আকৃষ্ট করেছে। চাষি পরিবার হলেও এদের রুচিবোধ আছে, শান্তি ও সৌন্দর্য আছে। খালিদার পিতা একটা জুনিয়র হাইস্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট মাস্টার মশাই। ছোটোখাটো চেহারার মানুষ। একদণ্ড এসেই দেখে চলে গেছেন। আমাদের মুরগি পোলাও ফলমূল খাবারেরও কত আয়োজন করেছেন। একে একে সব আসতে দেখে অবাক হয়ে গেছি। মনে হয়েছে, আহা এরা কী ভালো লোক! মানুষের কদরও বোঝেন! 
সব বুঝেসুঝেই বন্ধুটিকে সম্মতি জানিয়ে দিয়েছি। বারবার সে জিজ্ঞেস করেছে, রাজি তো? 
আমিও বারবার বলেছি, হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ! 
তারপর সে সব দায়িত্ব নিয়ে একাই গেছে মেয়ের পিতা অর্থাৎ তার মামা শ্বশুরের সঙ্গে কথা বলতে। আমাকে একটু দূরে সরে যেতে বলেছে। আমাদের তো বাড়ি ফেরার সময় হয়ে আসছে, যা বলার তা এখনই বলতে হবে। 

তিন. 

—তুমি কত টাকা বেতন পাও? 
—দেড় হাজার। 
—দেড় হাজার টাকায় সংসার যাবে? 
—টিউশান করি, তাতেও হাজার পাঁচেক… 
—টিউশানের কি কোনও ভবিষ্যৎ আছে? মেয়েকে ফেলে দেওয়া হবে! তোমার সঙ্গে… 
—আমি তো আসতেই চাইনি, আপনাদেরই জামাই বলেছিল, তাই… 
—থাক্ ওসব শুনব না, সরাসরি বলাই ভালো, তোমার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে পারছি না। 
তারপর জামাই অর্থাৎ আমার বন্ধুটির দিকে মুখ ফিরিয়ে বলতে লাগলেন, সবই ভালো, একটা চাকুরি করা ছেলের খোঁজ এসেছে। এন ভি এফ পুলিশ। বাবার মৃত্যুর পর ডাইং হারনেসে চাকুরিটি পেয়েছে। পড়াশোনা একটু কম, ওই অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। তা হোক, চাকুরি করে তো! বিয়েটা ওখানেই দেবার ইচ্ছা আছে। কী গো, ভালো হবে না? 
বন্ধুটি উদাসীন ভাবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। 
লজ্জায় অপমানে আমার দুই কান রাঙা হয়ে উঠল। সেখানে আর স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারলাম না। ঘটক বন্ধুটি অনেকক্ষণ পর ফিরে এল। শুকনো মুখে বলতে লাগল, মেয়েটির মা ও মেয়েটির খুব ইচ্ছা তোকে জামাই করার, কিন্তু ওর আব্বা চাইছে না। পাশের গাঁয়ের একটি লোক সম্বন্ধ নিয়ে এসেছে ওই পুলিশ কর্মীর জন্য। 
আমার আর কিছুই বলার নেই। ইউনিভার্সিটির ডিগ্রির ওজন যে ভীষণ হাল্কা একজন অষ্টম শ্রেণি পাস পুলিশ কর্মীর তুলনায় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এতক্ষণ ধরে মাংস পোলাও যা খেয়েছি সবই বমি হয়ে যাওয়ার উপক্রম। কোনও রকম ভাবে নিজেকে সামলে রাখছি। চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে আসছে। না, আর কোনওদিনও বিয়ে করতে চাইব না। বিয়ে করার জন্য আর কোনও মেয়েকে দেখতেও আসব না। তখনই হনহন করে ছুটছি। বন্ধুটি কী কথা বলছে পিছন থেকে বুঝতেও পারছি না, বোঝার প্রবৃত্তিও নেই। দুই কান ঝাঁ ঝাঁ করছে, কিছুই শুনতে পাচ্ছি না। দুঃখী মায়ের মুখটি চোখের সামনে ভেসে উঠছে। বাড়ি ফিরতে চাই, আমি দ্রুত বাড়ি ফিরতে চাই। কিন্তু এ কী! বাঁশঝাড়ের অন্যপ্রান্তে ম্লান মুখে দাঁড়িয়ে আছে খালিদা। সকরুণ চোখ দুটিতে মিনতি, ক্ষমা প্রার্থনা। চমকে উঠি। কেন ও এভাবে তাকাচ্ছে? হে আল্লাহ, যেখানে ওর আব্বা এত হিসেবি মানুষ, এত অহংকারের সঙ্গে আমার মুখের উপর কথাগুলি বলে আমাকে অপমান করলেন, সেখানে তারই কন্যা কেন এরকম ভাবে আমাকে হাতছানি দিচ্ছে? কোনও প্রশ্নেরই ঠিক উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না। তবে আমার অপমান, আমার পথহাঁটা যে অনেকটাই কমিয়ে দিতে পেরেছে সে সম্পর্কে কোনও সন্দেহ নেই। মনটা কীরকম উদাসীন হয়ে গেল। সারা রাস্তা চোখের সামনে ভাসতে লাগল সেই সকরুণ মুখটি। একটাও কথা বলতে পারিনি, নীরবে যেন বহুকথাই বলে দিয়েছি। 

চার. 

আজ যে বাস থেকে নামছি সেই বাসেই উঠতে যাচ্ছে খালিদা। নাকের পাশের তিলটি তেমনই কালো রঙেই জ্বল্ জ্বল্ করছে চাঁদ হয়ে। নামতে নামতে থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম। ছ্যাঁৎ করে উঠল বুক। সেই সকরুণ দৃষ্টি, সেই হাতছানি। কেমন আছ খালিদা? মুখে এনেও কথাটি বলতে পারলাম না। পেছনে জোর ধাক্কা, কী করছেন মশাই? রাস্তা ছাড়ুন! 
মনে মনে বলতে লাগলাম, আমি তো রাস্তা কারও ঘিরে নেই, কেউ আমারই রাস্তা ঘিরে আছে! 
বাস থেকে নেমে অনেকক্ষণ বাসের জানালায় চেয়ে থাকলাম বাসটা যতক্ষণ না ছাড়ল। খালিদাও জানালায় মুখ বাড়িয়ে দিয়েছে। তেমনই নির্বাক। তারই পাশের সিটে মধ্যবয়স্ক একজন পুরুষ। মনে হল ওর স্বামী। আমি তো ওর কেউ নই, কেনই বা আমার সঙ্গে কথা বলবে? তাহলে এমন চোখে তাকায় কেন? কী যেন হারিয়ে গেল আমার! আর নিজের অজান্তেই খুঁজতে লাগলাম। চোখের পানিতে চশমার কাচ ঝাপসা হয়ে গেল। দূরে বা কাছে কিছুই দেখতে পেলাম না। শুধু একটা গোল শূন্য অস্বচ্ছ বল ওঠানামা করতে লাগল সামনের দিকে।

শাওন দিনে--তমালিকা ঘোষাল ব্যানার্জী

শাওন দিনে--
তমালিকা ঘোষাল ব্যানার্জী

"ও বিন্তিদিদি, বাড়ি ফিরছো? এদিক দিয়ে এসো, তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাবে.."

বলেই পাশের গলির ভিতরে ছুট লাগায় বিট্টু। বিন্তিও তার পেছন পেছন ছোটে। ক'দিন হলো এসেছে, সব রাস্তাঘাট তেমন চেনাও নয়। তবে বিট্টুর উপর ভরসা আছে।

বিন্তির মামারবাড়ি খোয়াইপুর গ্রামে, মেধাবী মেয়ে সে। নিজেদের গ্রামের কাছাকাছি কোনো কলেজ না থাকায় মামারবাড়ি থেকেই পড়াশোনা করছে। সদরে কলেজ, তেমন দূর নয় মামারবাড়ি থেকে। সমস্যার কথা জানতে পেরে প্রস্তাবটা মামা নিজেই দিয়েছিলেন বিন্তিদের বাড়িতে। সেই শুনে সকলে রাজি হয়ে যায়। বিন্তির ইচ্ছা ছিল না বাবা মা ভাইকে ছেড়ে আসতে, কিন্তু উপায় কী! শুধু কলেজই নয়, মামারবাড়ির কাছে টিউশন কোচিংয়ের খোঁজও পেয়ে গেলো। যাতায়াতের পথে বিন্তির বন্ধুত্ব হয়ে যায় বিট্টুর সঙ্গে। বিট্টু তার ভাইয়ের বয়সী হবে। ওকে দেখলেই ভাইটার কথা মনে পড়ে যায়।

আজ পড়ে ফেরার পথে আকাশ কালো করে মেঘ ডাকতে আরম্ভ করলো। বর্ষার আকাশ। বইখাতার ব্যাগটা জাপটে ধরে বিন্তি ছুটতে শুরু করে। তখনই দেখে বিট্টুকে, তাকে আসতে বলে একটা গলির মধ্যে ঢুকে গেল। বিট্টুর পিছু নিল বিন্তি। এতে তার সুবিধাই হলো বেশ, তাড়াতাড়ি পৌঁছে গেলো। এইতো এই রাস্তাটাই ভালো, এবার থেকে এখান দিয়েই যাবে আসবে। কিন্তু কলেজ আর টিউশন পড়তে যাওয়ার পথে বিন্তি লক্ষ্য করে ওই রাস্তায় আর কেউ যায় না। রাস্তাটা ভালোই বেশ। একপাশে মাঠ, গাছপালা। অন্যপাশে একটা বড়ো পুকুর, পরিষ্কার টলটলে জল তাতে।

সেদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে, ছাতাতেও বাঁধ মানে না। অগত্যা ওই মাঠের পাশে একটা গাছের তলায় দাঁড়াতে হয় বিন্তিকে। চোখ চলে যায় উল্টোদিকের পুকুরটায়। কেউ আছে বলে মনে হচ্ছে! বৃষ্টিটা একটু কমলে হাঁটা ধরে সে। যাওয়ার পথে দেখে একজন মহিলা পুকুরঘাটে বসে নীচু হয়ে কোনো কাজ করছে, বাসনকোসন ধুচ্ছে মনে হয়। আর একটা লোক ছাতা ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তারপর থেকে যাতায়াতের পথে বিন্তি লক্ষ্য করে, শুধুমাত্র বৃষ্টির দিনেই পুকুরঘাটে ওই মহিলা আর লোকটা আসে। অদ্ভুত! বৃষ্টিতেই এদের পুকুরঘাটে বাসন ধুতে আসতে হয়!

ক'দিন যাবৎ কলেজের সামনে কয়েকটা ছোকরাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে। বিন্তির দিকে কেমনভাবে তাকিয়ে মিচকে হাসে, নিজেদের মধ্যে গুজগুজ করে কীসব কথাও বলে। মামাকে কী বলবে! তারপর ভাবে নাহ্ থাক, এমনিতেই মামারবাড়িতে থেকে পড়াশোনা করছে বলে তার মধ্যে একটা সঙ্কোচ কাজ করে। তার উপর এসব জানিয়ে মামাকে আর ব্যতিব্যস্ত না করাই ভালো। তবে বিন্তির মনটা আজ বেশ খুশি হয়ে আছে, তার কলেজের টেস্ট পরীক্ষা শেষ। ক'দিন রাতে ভালো করে ঘুমোতে পারেনি পড়ার চাপে, আজ জমিয়ে ঘুমোবে। ভাবতে ভাবতে হাঁটতে থাকে।

"কী মামণি, একা একা ফিরছো?"

চমকে ওঠে বিন্তি। পেছন ফিরে দেখে সেই ছেলেগুলো, বিশ্রীভাবে হাসতে হাসতে আসছে। ভয়ে গলাটা শুকিয়ে যায়। এ রাস্তায় এমনিতেই কেউ আসে না, প্রয়োজনে ডাকার মতো একটা লোক পাবে না সে। হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়। আজ আবার আকাশের অবস্থাটাও ভালো ঠেকছে না, বৃষ্টি এই নামলো বলে।

"আরে, জোরে হাঁটতে শুরু করলে যে! পছন্দ নয় নাকি আমাদের! দাঁড়াও না একটু.." ছেলেগুলোও জোরে হাঁটতে থাকে।

এমনসময় ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে। ছাতা খোলার কথা বিন্তির আর মনে থাকে না। দৌড়তে শুরু করে। কিন্তু এমনই কপাল, বেকায়দায় পা মচকে পড়ে যায়। ছেলেগুলোও সেই সুযোগে কাছে চলে এসে দাঁত বের করে হাসতে থাকে।

অসহায়ভাবে বিন্তি চেঁচিয়ে ওঠে, "কেউ আছ? বাঁচাও!!" তারপর ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে মিনতি করে, "প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন, আমি আপনাদের বোনের মতো!"

"কীযে বলো! দুনিয়াশুদ্ধু মেয়েদেরকে কি আমরা বোন বানাবো!" বলে ওঠে একটা ছেলে।

বিন্তি উঠে আবার দৌড়তে গিয়ে চোখ পড়ে পুকুরঘাটের দিকে। ওইতো বউটা আর লোকটা! তাদের দিকে ছুটে যায়।

"প্লিজ আমাকে বাঁচান.."

লোকটা ছাতা মাথায় ঘুরে দাঁড়ায়, ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। ততক্ষণে ছেলেগুলোও এগিয়ে এসেছে।

"এ বাঁচাবে! একে তো একটা থাবড়া দিলেই উল্টে পড়ে যাবে রে!" হাসতে থাকে ছেলেগুলো। "ও বৌদি, তোমার বরকে আঁচলে বেঁধে মানে মানে কেটে পড়ো। নয়তো.."

এবার বউটা পুকুরঘাট থেকে উঠে সামনে এসে দাঁড়ায়। ভয়ে বিস্ময়ে শিহরণ খেলে যায় বিন্তির গোটা শরীরে। বউটার চোখদু'টো সম্পূর্ণ সাদা, চোখের মণি নেই। গলার কাছে আড়াআড়ি চেরা, রক্ত জমাট বাঁধার মতো কালো হয়ে আছে।

লোকটা এবার ছাতাটা তুলে ধরে, এতক্ষণ ছাতার জন্য মুখখানা দেখা যাচ্ছিল না। লোকটার গলার উপর থেকে মাথাটাই নেই। ওই দেখে ছেলেগুলো ভয়ে আর্তনাদ করে ছুট লাগায়। বিন্তি আর স্থির থাকতে পারে না, জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে।

................................................................................

বিন্তির জ্ঞান ফিরলে দেখে সে মামারবাড়িতে বিছানায় শুয়ে আছে। মামা মামীমা ভাইবোনেরা উদ্বিগ্ন মুখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ঘরের একপাশে কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে আছে বিট্টু।

"এইতো, যাক বাবা, কী ভয়টাই না পেয়ে গেছিলাম! দাঁড়া তোর জন্য খাবার নিয়ে আসি।" মামীমা বলেন।

"বিট্টুর মুখে সব শুনেছি। তুমি পুকুরঘাটের রাস্তায় গিয়ে মোটেও ঠিক কাজ করোনি। একবার অন্তত আমাদের জানাতে পারতে।" গম্ভীর মুখে বলেন মামা।

বিন্তি বুঝতে পারে মামা যারপরনাই রেগে গেছেন। রেগে গেলে মামা "তুই" থেকে "তুমি" করে কথা বলেন।

"অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও তোমাকে না পেয়ে যখন আমরা পুলিশের কাছে যাবো বলে মনস্থির করি তখন বিট্টু আমাদের পুকুরঘাটের রাস্তায় নিয়ে যায়। ওখানেই পাই তোমায়। এবার থেকে ওই রাস্তা দিয়ে যেন না যেতে দেখি। বিট্টুকেও আমি বুঝিয়ে দিয়েছি।" হুঁশিয়ারি দেন মামা। বিন্তি চুপচাপ শুনে যায়।

রাতে খাওয়ার পর মামীমা বিন্তির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন যাতে সে ঘুমিয়ে পড়ে। মামাকে জিজ্ঞাসা করতে তো সাহসে কুলোয়নি, মামীর কাছে জানতে চায়।

"আচ্ছা মামীমা, পুকুরঘাটের ওই লোকটা আর বউটা কে?"

"কে বলতো?"

"একটা লোক, তার মাথা নেই। আর বউটার চোখদু'টো সাদা, গলায় কাটা দাগ।"

মামীমা চমকে ওঠেন, "সর্বনাশ! তুই দেখেছিস নাকি?"

বিন্তি ঘাড় নাড়ে।

"কী কাণ্ড!" মামীমা বলে যান, "বিয়ের পর এবাড়িতে এসে লোকমুখে শুনেছি, পুকুরঘাটের উল্টোদিকের মাঠের পাশে একটা বাড়ি ছিল। এখনও আছে, ভাঙাচোরা হয়ে জঙ্গলে ঢেকে পড়ে আছে, রাস্তা থেকে দেখা যায় না। ওই বাড়িতে নীলমণি বলে একটা লোক আর তার বউ থাকতো। কী একটা নিয়ে কতগুলো লোকের সঙ্গে বচসা বাঁধে নীলমণির। এরকমই এক বৃষ্টির দিনে নীলমণির বউ বাসন ধুতে পুকুরঘাটে যায়, নীলমণিও তার সঙ্গে ছিল। ওইদিন ওই লোকগুলো এসে নীলমণির বউয়ের গলা কেটে খুন করে তাকে আর নীলমণির মাথাটা ধড় থেকে আলাদা করে দেহটা পুকুরে ফেলে দিয়ে যায়।

তার ক'দিন পরে সেই লোকগুলোর প্রত্যেকে কোনো না কোনোভাবে মারা যায়। সবাই বলে নীলমণি আর তার বউ প্রতিশোধ নিয়েছিল। তারপর থেকে বৃষ্টির দিনে ওই রাস্তা ধরে যারাই গেছে, বলেছে নীলমণি আর ওর বউকে পুকুরঘাটে দেখেছে। এখন ওই পথে কেউ আর যায় না। আমি এতোদিন ভাবতাম লোকের মুখে মুখে ঘোরা এমনি গল্প। তবে তুই যখন চাক্ষুষ দেখেছিস, আর কোনো সন্দেহ নেই। বাবা রে, ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে! এতো কাছে ভূতের বাস!"

বিন্তি চুপচাপ শুনে যায়, ছেলেগুলোর ব্যাপারে কিছু আর জানায় না। কলেজ আবার শুরু হতে বিন্তি ভয়ে ভয়ে গিয়েছিল, তবে অন্য রাস্তা ধরে। তারপর থেকে ছেলেগুলোকে আর ওই এলাকার ত্রিসীমানায় দেখেনি সে।

(সমাপ্ত)

জীবনের হিসেব নিকেশ--রানা জামান


জীবনের হিসেব নিকেশ--
রানা জামান

 লাশ দাফন করার আগেই শুরু হলো অন্য আলোচনা। শুরুটা কে করেছে তা না খুঁজে পক্ষে বিপক্ষে মতামত চলছে।
কথাটা কানে যেতেই নড়েচড়ে বসলো সিলভিয়া। অশ্রু না মুছে মুখে আঁচলচাপা দিলো। সাথে সাথে নাফিস ও রাইসা ঢুকলো কক্ষে। ওদের মুখমণ্ডলে লেগে আছে অশ্রুর শুকনো দাগ।

সিলভিয়া কান্নার শব্দ বাড়িয়ে ছেলেমেয়ের দিকে দুই হাত বাড়িয়ে দিলো। কক্ষের অন্যান্যা মহিলারা ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। সবার মুখমণ্ডলে বিষন্নতার ছাপ। ছেলে-মেয়ে দুটো মার দিকে না গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকায় সবাই অবাক। সিলভিয়া এগিয়ে গিয়ে ওদের আশ্লেষে নিতে চাইলে দু'জন সরে গেলো পেছনে। এবার সিলভিয়া কান্না ভুলে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ওদের দিকে।

এক ভদ্রমহিলা জিজ্ঞেস করলেন ওদের, তোরা মার সাথে অমন করছিস ক্যান? কী হয়েছে তোদের?
জায়েদ বললো, এতোদিন মনে হয়েছিলো উনিও আমার মা। কিন্তু আব্বু মারা যাবার যাবার সাথে সাথে উনি দেখিয়ে দিলেন যে আসলে উনি আমার মা হতে পারেন নি।

তিতলি ফুপিয়ে উঠে বললো, আমি তো উনার পেটের মেয়ে। আমার কথাও ভাবলে না তুমি একথা ভাবার আগে।
কথা শেষ করেই হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো তিতলি।

আরেক ভদ্রমহিলা বললেন, কী কথা নিয়ে তোরা অমন রিএকশান করছিস? কী ভেবেছে তোদের মা? তোদের বাবার তো এখনো কবরও হয়নি।

সিলভিয়া বিছানায় ফিরে গিয়ে দুই হাতে মুখ ঢেকে বিলাপ করতে লাগলো। জায়েদ নির্বিকার থাকলেও তিতলির কান্না হৃদয়স্পর্শি।

প্রথম ভদ্রমহিলা তিতলিকে জড়িয়ে ধরে বললো, অমন করে কান্না করে না রে মা। সব ঠিক হয়ে যাবে।
তিতলি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললো, কিভাবে ঠিক হবে আন্টি? আম্মু তো বিয়ে করে আরেকজনের ঘরে চলে যাবে।
মেয়ের এ কথায় সিলভিয়ার কান্না গেলো থেমে। অশ্রু মুছে দু'জনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কে বললো তোদের একথা? কার কাছে শুনেছিস?

জায়েদ বললো, বাইরে অনেকেই বলাবলি করছে। আমার আম্মু মারা যাবার পর আব্বু তোমাকে বিয়ে করেছিলো। গেলো রাতে আব্বু হার্ট এটাকে মারা গেলো। লোকজন বলাবলি করছে তোমার জোয়ান বয়স। তুমি আরেকজনকে বিয়ে করে আমাদের রেখে চলে যাবে। সিলভিয়া বিস্মিত কণ্ঠে বললো, কী আশ্চর্য! তোদের বাবার এখনো কবর হয় নি, আর আমি এখনই ওসব ভাববো! কারা ওসব বলাবলি করছে, আমাকে দেখাবি। চল। আমি ওদের আচ্ছামতো বকে দেবো।

দ্বিতীয় ভদ্রমহিলা বললো, লাশ বাইরে রেখে সিনক্রিয়েট করা ঠিক হবে না। যার যা ইচ্ছা বলুক। তুমি রিএ্যাক্ট করলে লোকজন নানান কথা বলবে।

জায়েদ বললো, আমাকে মাফ করে আম্মু। আমি তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম। আমি এখনই বাইরে গিয়ে সবাইকে বললো যে আমার আম্মু কখনোই আবার বিয়ে করবে না।

এবার সিলভিয়া খাট থেকে নেমে ছেলেমেয়ে দুটোর কাছে ফের গেলো। দু'জনকে বুকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলো। জায়েদ ও তিতলিও মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো।

তখন দরজার বাইরে একটা পুরুষ কণ্ঠ বললো, লাশের গোসল হয়েছে। জানাজার পর লাশ নিয়ে যাওয়া হবে গোরস্তানে। কাশেম সাহেবের মুখটা শেষবার দেখতে চাইলে আসেন।

সিলভিয়া মাথায় ঘোমটা টেনে দুই ছেলেমেয়েকে বুকের দুইদিকে জড়িয়ে বাইরে যেতে থাকলো। কক্ষের ভদ্রমহিলাগণ ওদের পিছু নিলো।

এপার্টমেন্টের বেসমেন্টে খাটিয়ায় লাশ রাখা আছে। নতুন শাদা কাপড়ে ঢাকা খাটিয়া। খাটিয়ার চারকোণায় আগরবাতি জ্বলছে। সাথে আতর ও গোলাপজলের সুবাস। আগরবাতি, গোলাপজল ও আতরের সুবাস মনে করিয়ে দেয় মৃত্যুকে। মৃত্যু এক অনাকাঙ্খিত আগন্তুক; কোন জীব-ই মৃত্যু কামনা করে না; অথচ তা আসেই। মৃত্যু হাহাকার ছাড়া কোন গৌরব বয়ে আনে না। মৃত্যু আসে মুখব্যাদান করে, ভয়ঙ্কররূপে।
ওদের বেসমেন্টে ঢুকতে দেখে আজমত উদ্দীন একবার ফুপিয়ে এগিয়ে গেলো ওদের দিকে। সিলভিয়ার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললো, এসব কী শুনছি রে ভাগ্নি?

সিলভিয়া বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলো, কী কথা মামা?

তুই দ্বিতীয় বিয়ের কথা ভাবছিস।

মামা! ওর এখনো জানাজা হয়নি, আর তোমরা আমার দ্বিতীয় বিয়ে দেবার কথা ভাবছো!

একজন মুরুব্বী এগিয়ে এসে বললেন, তোমার বয়স অনেক কম মা। স্বামীর মৃত্যুর পর দ্বিতীয় বিয়ে করা দোষের কিছু না। এতে তোমার অবলম্বন হবে, নিরাপত্তাও হবে। একটা কথা মনে রেখো মা: একজন একা নারীর জন্য সমাজ ব্যবস্থা কখনোই ইতিবাচক না। নানান জন নানান কথা বলবে, শকুন থাবা দিতে চাইবে।

সিলভিয়া বিরক্তি চেপে রেখে বললো, আমি এখন এসব ভাবছি না চাচা। কারা এই কথাগুলো ছড়াচ্ছে?
মুরুব্বী বললেন, তুমি না বললেও পরিস্থিতি একথাগুলো বলছে। তোমার আর কাশেমের বয়সের পার্থক্য ছিলো অনেক। সেকারণেই কাশেমের মৃত্যুর পর তোমার বিয়ের কথা বলাবলি করছে সবাই।

এবার আরেকজন মুরুব্বী বললেন, স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবার দ্বিতীয় বিয়ে করতে কোন তালাকের প্রয়োজন হয় না। হাঁ, কাশেমের আগের বৌ-র ঔরশে এক ছেলে ও এই বিধবার এক মেয়ে আছে। যে পুরুষ এই বিধবাকে বিয়ে করবে, তিনি চাইলে এই দুই সন্তানকে সাথে রাখতে পারেন।

এবার সিলভিয়া রেগে বললো, চুপ করুন আপনারা, চুপ করুন! প্লিজ! দুইটা দুধের বাচ্চাকে রেখে আমি কোন দ্বিতীয় বিয়ে করছি না। আপনারা ছেলেমেয়ে দুটোকে ওদের বাবার মুখটা শেষবারের মতো দেখতে দিন।

সিলভিয়া ছেলেমেয়ে দুটোকে বুকে চেপে ধরে ফের ফুপিয়ে উঠলো।

সিলভিয়ার মামা জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, আমি তখনই বলেছিলাম এতো বয়স্ক লোককে বিয়ে করার দরকার নাই। একটা বাচ্চা নিয়া কি সারা জীবন চলা যাবে?

আরেক জন মুরুব্বী বললেন, অসম বয়সে বিয়ে হলে এই সমস্যা হবেই। এবার বিয়ে দেবার সময় ছেলের বয়সটা দেখে নিয়েন জাহাঙ্গীর ভাই। নইলে দেখা যাবে আপনার ভাগ্নীর মৃত্যুর পর ভাগ্নী জামাই-এর আবার বিয়ে করার প্রয়োজন হবে। এই পরম্পর চলতে থাকলে হিস্ট্রি হয়ে যাবে!

এসব আলোচনা মোটেই ভালো লাগছিলো না সিলভিয়ার। সে জাহাঙ্গীর হোসেনকে উদ্দেশ্য করে বললো, আগেও বলেছি, এখনো বলছি, এসব কথাবার্তা আমার একদম ভালো লাগছে না মামা। ছেলেমেয়ে দুটো কী মনে করবে ভাবো তো একবার মামা!

জাহাঙ্গীর হোসেন ছেলেমেয়ে দুটোর দিকে তাকিয়ে বললো, তাও ঠিক।

জায়েদ জাহাঙ্গীর হোসেনের দিকে তাকিয়ে বললো, তুমি খুব পঁচা হয়ে গেছো নানা।

সাথে সাথে তিতলিও বললো, মেঝো নানা পঁচা।

প্রতিশোধ (প্রাপ্তবয়স্ক) -- রূপসা রায়

প্রতিশোধ (প্রাপ্তবয়স্ক) -- 
রূপসা রায় 

পরনে নেটের শাড়ি, হাতকাটা ব্লাউজ, লাল লিপস্টিক, কালো আইলাইনার আর চড়া মেকাপে নিজেকে সাজিয়ে তোলে অনন্যা। সুডৌল স্তন, উদ্ধত নিতম্ব ফুটে উঠছে শাড়ি ভেদ করে। 
সাজ শেষ করে আয়নার সামনে থেকে উঠতেই অনন্যা লক্ষ্য করে তার স্বামী অলোকেশ তার দিকে তাকিয়ে, দৃষ্টি খেলে যাচ্ছে শরীরের আনাচে কানাচে। 
- "এই বলছি, রাতে কি বানাতে বলবো মালতি দি কে?"
অলোকেশ - "যা খুশি।" ভারি নির্বিকার চিত্তে উত্তর দেয়। 
অনন্যা - "উফ এতো উদাসীনতা কেনো তোমার? আমার শরীর আর খাওয়া এই দুটো নিয়ে এতো উদাসীনতা মেনে নেওয়া যায়না। "
অলোকেশ ভয় চোখে তাকালো, ঢোক গিলে প্রশ্ন ছুড়লো - "মানে?"
অনন্যা - "ওমা সেকি! ভুলে গেলে সব! সেই যে আমার উনিশ বছর যখন, আমায় আনলে বিয়ে করে। তখন তোমার বয়স ত্রিশ। টেস্টোস্টারণের নেশায় প্রতি রাতে আমায় ধর্ষণ করতে, পাশবিক জানোয়ারের মতো আমার শরীরটা খুবলে খুবলে খেয়ে আঁশ মেটাতে। কিন্তু আমি সেভাবে সঙ্গ দিতে পারতাম না তাই বাইরেও টিনা, সহেলি ওদের সাথে ফ্ল্যাটের বিছানায় উদ্দাম যৌনসুখ। রান্নাটাও ভালো পারতাম না, কাজের লোক রাখলে ঠিকই তবে তোমার রান্না আমায় করতে হত। আর রোজ খুন্তির ছ্যাঁকা, সিগারেটের জ্বলন্ত আগুনে পুড়িয়ে দিতে আমার বুক। সব ভুলে গেলে নাকি? শারীরিক সন্তুষ্টি দূরে থাক, শুধু ব্যাথা পেয়েছি আমি! তো আজ তো আমি পরিপূর্ণ একদম। এবার এসো আমার কাছে! তোমার শরীরকে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট করতে পারবো আমি, আমারো শারীরিক ক্ষুধা আছে সেটা না মেটাতে পারলে আমায় এবার অন্য পুরুষের কাছে যেতেই হবে তাই না? শরীরী খিদে মিটবে না বলে বাচ্চা নাওনি উপোস থাকতে হবে বলে কিন্তু আমার যে চাই অলোকেশ.."
অলোকেশ চিৎকার করে ওঠে - "অনন্যা!!"
কলিংবেল বাজার শব্দে বলে ওঠে অনন্যা - "তুমি থাকো, মনে হয় আমার অফিসের গাড়ি এসে গেছে। আমি কাল সকালে বাড়ি আসবো ঠিক আছে? আসি কেমন?" 
দু বছর ধরে প্যারালাইসিস অলোকেশ। কোমরের নিচ থেকে কাজ করেনা আর, পুরুষাঙ্গ তার কার্যক্ষমতা হারিয়েছে। এতদিন ধরে অনন্যার ওপর করে আসা অত্যাচারের প্রতিশোধ কি এটাই? 
অনন্যাকে ঠিক সুবিধার লাগছেনা। তাহলে কি ও যেমন অনন্যা থাকতেও সহেলি, টিনা ওদের সাথে.. তেমনকি অনন্যাও? অপরাধের বদলা হিসাবে প্রতিশোধটা গুছিয়ে নিচ্ছে অনন্যা।

ঘুষখোর -- তুষার ভট্টাচাৰ্য

ঘুষখোর -- 
তুষার ভট্টাচাৰ্য
-------------------------------------------------------
 অফিসে ঢুকেই তনুশ্যাম বসু দেখতে পেলেন গেটের   দেওয়ালে  পোস্টার লেখা রয়েছে - ' ঘুষখোর, চোর ম্যানেজিং ডিরেক্টর তনুশ্যাম বসুর   শাস্তি চাই l'
 এইসব গা- সওয়া হয়ে গিয়েছে তনুশ্যাম বাবুর l এই দেশে কে সৎ আছে? মন্ত্রী থেকে সান্ত্রী সবাই সুযোগ পেলে ঘুষ খায়, চুরি করে l
      চেম্বারে ঢুকে তনুশ্যামবাবু বেল টিপলেন l পিওন রামসরণ এসে  বলল - সাব কিছু বলবেন l
হ্যাঁ - গণপতি বাবুকে ডেকে দাও l
 
 গণপতি দাস চেম্বারে ঢুকে বললেন - স্যার আমাকে ডেকেছেন l
হ্যাঁ, জানেনই তো আমার অবসরের আর এক বছর রয়েছে l তাই এবারে অফিস পিকনিকে আমি আপনাদের একটা নতুন জায়গায় নিয়ে যাবো l  পিকনিকের সব খরচ কিন্তু আমার l
পিকনিক আগামী রোববারেই হবে l  রোববার সকাল আটটার মধ্যে সবাই  যেন অফিসে চলে আসে  l একটা বাস থাকবে  l আমিও যাবো  l  আপনি অফিসের সবাইকে একটু বলে দেবেন l

রোববার দুপুরে  প্রায় একশো কিমি দূরে গিয়ে বাসটা  থামলো l
তনুশ্যাম বসু  বাস থেকে  সবাইকে নিয়ে নেমে  একটা  ইস্কুল বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন l
তারপর স্মিত  হেসে বললেন - এই যে আপনারা  সবাই দেখুন, আমি  ঘুষ, চুরির টাকায় তৈরি করেছি - আগমনী স্মৃতি অনাথ স্কুল l এখানে একশোজন অনাথ ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া শেখানো, খাওয়া পরা, থাকা সব কিছুরই দায়িত্ব নিয়েছি আমি l 
জানেনই তো বিয়ে থা করিনি l পুরো বেতনের টাকাটাই  এই ইস্কুলের জন্য খরচ করি l 
আপনারা হয়তো জানেন না আমি  অনাথ আশ্রমে থেকে মানুষ হয়েছি l বাবা মারা যাবার মা খুব  অভাবের জন্য একদম ছোট্ট  বয়েসে আমাকে অনাথ আশ্রমে দিয়ে দিয়েছিল l আমার  মায়ের নামেই এই ইস্কুল তৈরি করেছি l কারও কাছে এক পয়সা ঘুষ, কাটমানি খাইনি l অনাথ আশ্রম তৈরি করবো বলে সবার কাছে ভিক্ষা চেয়েছি l
বিশ্বাস করুন '-আমি চোর নই l'
এই সব কথা বলে তনুশ্যাম বাবুর দু'চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা জল ঝরে পড়ল l 
   এম ডি তনুশ্যাম বসুর মুখে  এইসব কথা শুনে অফিসের সবার চোখেই শ্রদ্ধা ঝরে পড়ল সহসাl 
 গাছ গাছালিতে ভরা   ইস্কুল চত্বর ঘুরে সবাই  দেখতে পেল - যাঁরা আর্থিক সাহায্য করেছেন   সবারই  নাম এবং টাকার পরিমাণ শ্বেতপাথরে খোদাই করা রয়েছে l
ইস্কুলের মাঠে কচি কাঁচা ছাত্র ছাত্রীরা   শীতের মিষ্টি রোদ্দুরে ভিজে খেলাধুলো করছে প্রাণের আনন্দে l তাদের কলকাকলিতে মুখরিত হচ্ছে চারপাশ l

নাগপাশ--রবীন বসু


নাগপাশ--
রবীন বসু

আমাদের গল্পের হরিদাস অত্যন্ত সরল সাদামাটা একটা ছেলে। তার মধ্যে কোন ঘোরপ্যাঁচ নেই। সে সবাইকে বিশ্বাস করে। আর এই বিশ্বাস করতে গিয়ে বার বার ঠকেছে। এমনকি এখনও ঠকছে। 
ব্যাপারটা খোলসা করেই বলি। বুড়ো মা যতদিন বেঁচে ছিল, তাকে আগলে রেখেছিল। বাবা সেই কোন ছোটবেলায় মারা গেছে। মুখটা ঠিক মত মনেও পড়ে না। বাড়ির দেয়ালে বাবার কোন ছবিও নেই। বাস্তু ছাড়া এক টুকরো ক্ষেতি ছিল। সেখানে সব্জি চাষ করে মা-ছেলের সংসার চলত। দু'জন মিলে কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়ে, জল ঢেলে বিভিন্ন মরশুমে বিভিন্ন সব্জি চাষ করত।  বাগান থেকে ‌ফসল তুলে ঝাঁকা ভর্তি করে ভ্যানরিক্সায় চাপিয়ে হাটে নিয়ে পাইকারি দিয়ে আসত। ভালই চলছিল। কিন্তু সমস্যা হল তিন দিনের এক অজানা জ্বরে মা হঠাৎ মারা যেতে। ডাক্তারও বুঝতে পারল না কী জ্বর। সেই থেকে হরিদাস কেমন একা হয়ে গেল। উনুন জ্বেলে হাত পুড়িয়ে রান্না করে খেতেও ভালো লাগতো না। তাই অনেক সময় আধপেটা খেয়ে, মুড়ি পান্তা দিয়ে পেট ভরাত। রাতে শুতে গেলে খুব একা লাগতো। শরীর যেন কিছু চাইতো। মনটা সব সময় উদাস উদাস। একদিন হাটে পুবপাড়ার সদাশিব কাকা তাকে হাত ধরে বসাল। 
"হরি, বোস। মিষ্টি খা। তোর সাতে কতা আচে।"
"কী বোলবে শিবকাকা? হরিদাস জানতে চায়। "বাড়ি ফিরতি হবে। গাচে জল দোব।"
"সে তো দিবি। কিন্তু নিজের শরীলে কবে জল দিবি বাপ্!"
"মানে!" কী বলচ তুমি?"
"বলচিলুম, জোয়ান ছেলে, শরীলটা দেকেচিস! কেমন পাকাটি হয়ে যাচ্চিস দিন দিন। কতদিন হাত পুড়িয়ে খাবি? তাছাড়া যৈবনের তো একটা খিদে আছে। আমি বলি কি এট্টা বে' কর, বাপ্।'
বে'র কথা হরিদাসের যে মনে হয়নি তা নয়। যুবতী মেয়ে দেখলে শরীর কেমন জানান দেয়। রাতে স্বপ্ন আসে। কিন্তু সাহসে কুলোয়নি বে' করতে। মা থাকলে তবু হত। 
"আচ্চা, ভেবে দেখি কাকা, কটা দিন আমাকে সোময় দাও।''

এর ঠিক চারমাস বাদে বোশেখের শেষ দিকে হরিদাসের বিয়ে হয়ে গেল। তিন গাঁয়ের পরের গাঁ পলাশপুরের ঈশ্বর চিন্তামনি মণ্ডলের একমাত্র মেয়ে সরমার সঙ্গে। শিবকাকাই সব ব্যবস্থা করল।
কিন্তু অষ্টমঙ্গলায় গিয়েই হরিদাসের চটক ভাঙে। চিন্তামনি মণ্ডলের বিধবা বউ মানে হরিদাসের শাশুড়ি খাওয়াদাওয়ার পর একটা হাতপাখা নিয়ে বিছানা দখল নিল। তারপর মাঝরাত পর্যন্ত উপদেশ পরামর্শ। তার মোদ্দা কথা হল, ওবাড়ির পাট চুকিয়ে এখানে এসে থাকতে হবে। বাস্তু বাগান সব সরমার নামে লিখে দিতে হবে ‌। 
হরিদাস চেঁচিয়ে উঠেছিল। "আমার বাপ-মার ভিটে থাকতে আমি এখানে ঘরজামাই থাকতি পারবুনি। আর সম্পত্তি আমি কাউকে নিকে দেবনি।"
শাশুড়ি ছুটে এসে হরিদাসের গলা চেপে ধরে। সঙ্গে সরমা। "দিবি না মানে। তোর মরা বাপ দেবে। শিবেকে  বলে তোর মত একটা ক্যাবলাকে জামাই করিচি সে কি শুদু শুদু দুধু খাওয়াব বলে।"
হরিদাস এবার বুঝতে পারে ষড়যন্ত্রের মূল শিবকাকা। ওকে বিশ্বাস করাই তার ভুল হয়েছে। মরা মার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। জলে ভরে গেল চোখ। এখন সে কী করবে! মাথা ঠাণ্ডা রেখে একটা উপায় বের করতে হবে। 
অষ্টমঙ্গলার পর ফিরে এসে সে শিবকাকার মুখোমুখি হয়। "তোমাকে বিশ্বেস করলুম আর তুমিই পিঠে ছুরি মারলে।"
"ছুরি মারব কেন রে। ব্যাপারটা মেনে নে। সরমা তোর বউ। তার তো একটা ভবিষ্যৎ আছে। সম্পত্তি নিকে দে।" 
"আমি মরলে তো ওই সব পাবে। আগে নিকে দুবুনি।" হরিদাসের গলায় দৃঢ়তা।
সদাশিবের আসল দাঁত নখ বেরিয়ে পড়ল। রক্তচক্ষু নিয়ে সে বলল, " দিবিনি তো! তা'লে কিন্তু তোর কপালে ভোগান্তি আছে। সরমাকে দিয়ে থানায় তোর নামে বধূনির্যাতনের কেস করাব। পুলিশ তোকে অ্যারেস্ট করবে। জেল হবে। কে তোর জামিন করাবে হরি! জেলে পচতি হবে।"
হরিদাস এবার ভয় পায়। সত্যি তো। কেস হলে সে কী করবে? কে তাকে সাহায্য করবে? কাকে সে বিশ্বাস করবে? তার টাকার জোর নেই। আতান্তরে পড়ে হরিদাস হতাশার গভীর গর্তে সেঁধিয়ে গিয়ে  মরিয়া চেষ্টায় উঠে দাঁড়াল। তারপর একরকম টলতে টলতে গাঁয়ের প্রধান ভবতোষ গায়েনের কাছে গেল। সব খুলে বলে। ওখানেই জানতে পারে চিন্তামনির বিধবা বউ আসলে সদাশিবের রক্ষিতা। ওকে বিয়ে দিয়ে সে হরিদাসের বাস্তু বাগান করায়ত্ত করতে চায়। এখন উপায়? 
"উপায় তেমন কিছু নেই হরিদাস। বিয়ের আগে একবার আমার কাছে আসতে পারতে। ওরা যে কোন সময় থানাকে টাকা খাইয়ে তোমাকে ৪৯৮এ কেসে ফাঁসিয়ে দিতে পারে।"
"তাহলে আমি কী করব এখন?" হরিদাস ভেঙে পড়ে।
"বসো। জল খাও। আমাকে একটু ভাবতে দাও।"
ভবতোষ মওকা বুঝে জাল বোনে। ছোট ছেলেটার সঙ্গে ঠিক বনিবনা হচ্ছে না। হরিদাসের বাস্তুটা পেলে তাকে ভেন্ন করে আলাদা করে দেয়। সুযোগ যখন এসেছে একবার চেষ্টা করা যাক।
"একটা উপায় আছে হরি। ভেবে দেখ, ওরা কিন্তু কিচুতেই তোমাকে ছাড়বে না। জোর করে ভয় দেখিয়ে, মারধর করে সম্পত্তি ঠিক নিকিয়ে নেবে। আর তারপর তোমাকে নাতি মেরে বের করে দেবে। আমি বলি কী, তার আগে তুমি বাস্তু বাগান বিক্রি করে দাও। আমি তোমাকে ইস্টিশনের কাচে সরকারি ভেস্টেড ল্যান্ড থেকে কিছুটা জমি পাট্টা দেবার ব্যবস্থা করে দেব। তুমি দোকান করে দিব্যি থাকবে।"
হরিদাস অসহায় ভাবে বলে, "কে কিনবে, কাকা?"
"কেন, আমি কিনব। তবে বাপু পুরো দাম পাবে না। তোমাকে যে জায়গা পাট্টা দেব তার জন্য তো একটা খরচ আছে।"
হরিদাস আরও ধাঁধায় পড়ে গেল। তার মাথা ঝিমঝিম করছে। মানুষ সবাই কেমন লোভ নিয়ে, উদ্দেশ্য নিয়ে বসে আছে। অসহায় বিপদগ্রস্তকে আরও বিপদে ফেলে। একসময় নিজেকে শেষ করে দেবার যে প্রবণতা তার মধ্যে ছিল, আবার তা চাগাড় দিচ্ছে। এবার উঠে দাঁড়াল সে।  পিছনে প্রধানের গলা ভেসে আসে, "হরিদাস আমি ছাড়া তোমাকে কেউ বাঁচাতি পারবে না…"
এ কোন নাগপাশে জড়াল জীবন। অবলম্বনহীন শূন্যতায় দুলতে দুলতে হরিদাস অন্ধকারে বাড়ির পথ ধরল… 
       ‌                          ••

যত্নশিল্প--সৌমেন দেবনাথ

যত্নশিল্প--
সৌমেন দেবনাথ 

আইসক্রিমওয়ালাকে দেখেই পূর্বা ভীষণ উচ্ছ্বসিত হলো। বাচ্চা মেয়ের মত হাত পা ছুঁড়ে নাকে স্বর উঠিয়ে বললো, আইসক্রিম খাবো।
আইসক্রিম খাবে পূর্বার এই বাচ্চামোটা রজতের ভালোই লাগলো। প্রিয় মানুষের এমন ছোট ছোট চাওয়াগুলো পূরণ করলে আনন্দই লাগে। বড় বড় কোন চাওয়া নেই, ছোট্ট ছোট্ট প্রার্থনা তার। গভীর আর প্রগাঢ় সম্পর্কের মধ্যে অযাচিত কোন চাওয়া থাকে না। অল্পতে অনেক আনন্দ পায় যে, অনেক সুখী সে। মনে অল্প অল্প চাওয়া যার, মন তার অনেক বড়।
ফুচকার দোকান দেখলেই থেমে যাবে পূর্বা। ফুসকাওয়ালা পূর্বাকে একদিন না দেখলেই বলে, আপা কই ভাই?
পূর্বার কারণে রজতকে প্রত্যহ যে ফুসকা(ফুচকা) খেতে হয় আর তাতে করে রজত-পূর্বার মুখদ্বয় যে ফুসকাওয়ালার(ফুচকাওয়ালা) কাছে মুখস্ত হয়ে গেছে তা নিশ্চিত। ফুসকা পেলে পূর্বার আর কিছু লাগে না। কে বা কারা বলে নারীকে খুশি করতে কাঠ-খড়ি পোড়াতে হয়! কে বা কারা বলে নারীর চাওয়া অনেক বেশি! কে বা কারা বলে তাদের চাওয়া পূরণ করার সাধ্য পুরুষের নেই! অল্পে নারীর সন্তুষ্টি নেই কারা ছড়ায় এ কুবাক্য! অল্পে তুষ্টি পূর্বার হাসিমাখা মুখ দেখলে রজতের ভীষণ ভালো লাগে। তার ঐ হাসিমাখা মুখ দেখলেই ভীষণ সুখ অনুভব হয়। নির্মল তুষ্টির হাসিগুলো দেখতে খুব পবিত্র লাগে।
দুজনে রিক্সা চড়ে বাড়ি ফিরছিলো। অটোতে চড়ে দ্রুত বাসাতে ফিরতে পারতো, কিন্তু রিক্সাতেই চড়েছে৷ কারণ রিক্সাতে চড়া পূর্বা পছন্দ করে। বাম পাশে বসে দুই হাতে রজতের বাম হাত জড়িয়ে বসে। বড় নির্ভরতার হাত। দায়িত্ববান হাতের ছোঁয়াতেই প্রতিটি নারী সুখী। রাস্তা সংলগ্ন খোলা মাঠে মেলা বসেছে। পূর্বা বায়না ধরলো চুড়ি নেবে। বাড়ি ফেরার প্রতিই তাড়া ছিলো রজতের। অনিচ্ছা সত্বেও মেলাতে গেলো। চুড়িই তো চাচ্ছে, অতি ক্ষুদ্র ও কম দামী, ক্ষুদ্র আর কম দামী হলেও গুরুত্ব তার অনেক। অনেক ক্ষুদ্র জিনিসও সময়ে দামী হয়ে উঠে। চুড়ি কিনে পরলো, রজতকে দেখিয়ে বললো, দেখো না কত সুন্দর!
কথাটি বলার সময় পূর্বার মুখে যে উচ্ছল ভাবটা দেখা গেলো কোটি টাকা দিয়েও তা কেনা যাবে না। পূর্বার মুখে হাসি ফোটানোর জন্য খুব বেশি চেষ্টা করা লাগে না। একটু সময় সাথে থাকলেই সে খুশি। হাতটা ধরে একটু হাটলেই সে খুশি। চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বললেই সে খুশি। কাজল চোখের প্রশংসা করলেই খুশি। নাকের নলকের প্রশংসা করলেই খুশি। 
কোম্পানিতে চাকরি করে রজত। পরিশ্রম বেশি, বেতন কম। কম বেতন হলেও তাদের তেমন কষ্ট হয় না৷ একটি রুম ভাড়া করে থাকে, ফ্ল্যাট বাড়িও ভাড়া করা লাগেনি। বাসায় বিলাসিতার তেমন কিছু নেই। নেই আলমিরা(আলমারি) কিংবা ফ্রিজও। কিন্তু তা যেন তাদের প্রয়োজনও না। যা আছে তাই নিয়েই যেমন থাকার কথা তারচেয়ে খুব ভালো আছে। যেকোনো অবস্থাতেই এই ভালো থাকার চেষ্টাটা ভীষণ জরুরি। ভালো থাকার এই সূত্র বা মন্ত্র শিক্ষা দিয়ে হয় না, পরিশুদ্ধ বোধ থাকলেই হয়। 
পরের দিন বাসায় ফেরার পথে রজত একটা শাড়ি কিনে আনলো। চার মাস পূর্বে আরো একটা শাড়ি কিনেছিলো সে। প্রতি সপ্তাহে শাড়ি কিনে দিয়েও অনেক স্বামী স্ত্রীর মন পায় না। চার মাস পর নতুন শাড়ি দেখে যারপরনাই খুশি পূর্বা। ভাজ(ভাঁজ) খুলে দেখছে, শরীরের সাথে রেখে রেখে দেখছে আর বলছে, খুব সুন্দর। কি সুন্দর, দেখো আমাকে অনেক সুন্দর লাগবে।
রজত বিস্মিত হয় পূর্বার উচ্ছ্বাস দেখে। যত দাম দিয়েই কেনা হোক না কেন স্বামীর শাড়ি কিনে আনা স্ত্রীর পছন্দই হয় না। অথচ পূর্বা তাদের চেয়ে কত ব্যতিক্রম। পাশের বাজারের শাড়িতে যে নারী খুশি সে নারীর যমুনা ফিউচার পার্কে, বসুন্ধরা শপিংমলে শপিং করতে যাওয়া লাগে না। স্বামীর পছন্দই তার পছন্দ। স্বামীর পছন্দের গুরুত্ব দিলে স্বামীও যে খুশি হয়, স্বামীর অতি শ্রমের টাকায় কেনা জিনিসকে মূল্য দিলে স্বামীরও যে কত ভালো লাগে অনেক স্ত্রীই তা জানে না৷ 
চাঁদ উঠেছে। চন্দ্রালোকে চারিদিক প্লাবিত। জ্যোৎস্নায় ভিজবে বলে পূর্বা বায়না ধরে। পূর্বার বায়না রক্ষা করা রজতের জন্য খুব কঠিন কোনকালেই হবে না এটা রজত বুঝে গেছে। ঘরের লাইট বন্ধ করে দিয়ে জানালায় বসে বসে ওরা জ্যোৎস্না দেখতে লাগলো। জ্যোৎস্না দেখে খুশি যারা তাদের তাজ মহল দেখতে বিদেশ যাওয়া লাগে না(দরকার পরে না)। সাধ্যের মধ্যে সুখ খোঁজে যারা তারাই সুখের সংগা(সংজ্ঞা) জানে, তাদের কাছে সুখ প্রাপ্তির মন্ত্রখানি সহজ। বাড়-বাড়ন্ত চাওয়া থাকে যাদের তাদের সুখ হয় না, শান্তি হয় না। যাদের চাহিদা বেশি তারা কোন কিছুতেই সুখী নয়। 
বাসার নিচের দোকানে গেলো রজত। কয়েকজন ব্যক্তি বসে তর্কতর্কি করছে। একজন বললো, স্বামীর চেয়ে অন্যপুরুষকে প্রাধান্য দিতেই নারী বেশি পারদর্শী। সব পুরুষ কর্মঠ, নিজের স্বামী ছাড়া। সব পুরুষ সুন্দর, নিজের স্বামী ছাড়া। পরের স্বামীর সাথে তুলনা করে নিজের স্বামীকে অবদমন করাতেই নারীর কৃতিত্ব। 
তার পাশের জন বললো, আসলেই নিজ ঘরে নারী সুখী নয়, পাশের বাসার ভাবীই শুধু সুখী।
অন্য আর একজন বললো, শাশুড়ির ভূমিকায় বউয়ের বিরুদ্ধে ছেলের কান ভারি করে, কিংবা বউয়ের ভূমিকায় পতিদেবতাকে পাতিনেতা বানিয়ে কুটনৈতিক চাল চেলেও নারী সুখ খোঁজে। 
একজন অবিবাহিত ছেলে ছিলো, সে বললো, বখাটে পোলাপানের টালটু-পালটুতে অনেক নারী সুখী।
রজত বুঝতে পারলো, নারী কিসে সুখী এই নিয়েই আজ দোকানে তর্কতর্কি চলছে। এসব নিজেদের অদক্ষতারই আর কিছুর ফল না। বাসায় নিজ স্ত্রীদের সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখতে পারছে না নিজেদের কারণেই, দোকানে বসে স্ত্রীদের ছোট করে উপস্থাপন করছে। 
আর একজন বললো, নারী স্ট্রাগল করে সুখী হতে চায় না, সহজে যেখানে সুখী হওয়া যায় সেখানেই সুখ খোঁজে।
রজত মুখ খুললো, বললো, সংসারে নারীকে সম্মান দিন, গুরুত্ব দিন; নারী সুখ ঢেলে দেবে। 
পাশ থেকে একজন একথা শুনে ক্ষেপে গেলো, বললো, চড়ুই পাখি দালান-কোঠা ছাড়া থাকতে পারে না। দালান-কোঠা কত জন গড়তে পারে? সামর্থ্যের সীমা তো বুঝতে চায় না।
রজত বললো, দালান-কোঠাতে থাকলেই সুখ হয় না, সেটা বোঝাতে হবে। সম্পদে সুখ খুঁজলে সুখ মিলবে না,  সেটা বোঝাতে হবে। যে পুরুষ বাবা-মা, ভাই-বোন, স্ত্রীকে নিয়ে সৎ ভাবে সুখী হওয়ার চেষ্টা করে সেই পরিবারে সবাই-ই সৌভাগ্যবশত সুখী হবে। 
অন্যজন বললো, পুরুষের দোষ খুঁজবেন না। সংসারে পুরুষের ত্যাগ কেউ বোঝে না। পুরুষের ত্যাগ সব বৃথা যায়, কারণ নারী জানেই না তারা কিসে সুখী! তারা যে কি চায়! 
অবিবাহিত যুবকটা বললো, একাধিক পুরুষের মন নিয়ে খেলতে পারলেই নারী সুখী। প্লেবয় পোলাতেই নারী সুখী। পরকীয়াতে আরো সুখী।
অবিবাহিত যুবককে থামিয়ে আর একজন বললো, নারী যা চায় আমি মন দিয়ে চাই সে সব পাক, এবং পাওয়ার পরে বুঝুক সব কিছু পেলেও কোন লাভ হয় না, সুখ মেলে না।
কথাতে সায় দিয়ে আর একজন বললো, সামান্য লিপস্টিক হারিয়ে গেলেও যে নারী কান্না করে(কাঁদে) আমার মনে হয় না তারা কোন কালে সুখী হবে। 
অবিবাহিত যুবক বললো, নারী যার পকেটে টাকা বেশি তার বুকে সুখ খোঁজে, কিন্তু সেখানেও সুখ পায় না। তখন পরকীয়া করে। হাজার ছেলের পকেট কেটে খেয়ে টাকা দেখে টাক আর ভুঁড়িওয়ালাকে বিয়ে করে সুখী হওয়ার ভান করে।
রজত বললো, অবিবাহিত আপনি আমি জানি। আপনি কল্পনা থেকে আজগুবি কথা বলছেন। তার কাছেই নারী সুখী যার কাছে তার কথার মূল্য আছে। তার কাছেই নারী সুখী যে তার সব আবদার না হোক কিছু আবদার পূরণ করেই। বিনয়ী স্বামীতে নারী সুখী। সুস্থ ও কর্মনিষ্ঠ নারী সুখীই। 
দূর থেকে একজন বললো, রাখেন আপনাদের কথা। নারী কিসে সুখী এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পর্যন্ত বের হয়নি, বা বের হওয়ার তারিখও নেই।
রজত না-সূচক মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, ভালোবাসতে যে জানে, ভালো রাখতে যে জানে, সম্মান দিতে যে জানে তার কাছে নারী আমৃত্যু থাকতেই রাজি। ভালো রাখতে জানতে হবে, ভালোবাসতে জানতে হবে, সম্মান দিতে জানতে হবে, সুখে থাকার সূত্র এটা।
রজত এক কাপ চা খেয়ে চলে এলো। এসে দেখে পূর্বা রান্না করছে। রজত রান্না দেখতে দেখতে বললো, পৃথিবীর সেরা রাধুনীও তোমার হাতের রান্নার কাছে নস্যি।
শুনে হেসে দিলো পূর্বা। একটু প্রশংসা করলে নারী কত খুশি হয়! অথচ এই প্রশংসাটুকুও করে না কেউ। মিথ্যা হলেও যদি বলা হয় তোমাকে আজ খুব সুন্দর লাগছে; জীর্ণ একটা সম্পর্কের মাঝেও জোয়ার আসে। রজত বললো, দোকানে সবাই আলাপ করছিলেন নারী কিসে সুখী, তুমি কি আমাকে সত্যটা বলবে?
পূর্বা বলতে চাচ্ছিলো(চাইছিল) না, একান্ত বাধ্য হয়ে বললো, একজন দায়িত্বশীল ভালো মনের মানুষের বুকে মাথা রেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয়ার মাঝেই নারীর সুখ।
অবাক হয়ে শুনলো রজত। তারপর বললো, টাকার বালিশে মাথা রাখলে নাকি নারী সুখী হয়! 
পূর্বা বললো, পাতার বস্তাতে মাথা রেখেও অনেক নারী সুখী। আভিজাত্যেও অনেকে সুখী না। অনেক নারী শপিং করতে পারলেই সুখী। অনেক নারী গহনাতেই সুখী। অন্য নারীর চেয়ে আমার বেশি এটা জাহির করতে পারলেও অনেক নারী সুখী। ভালো রেস্তোরেন্টে খেতে পারলেই কেউ কেউ খুব সুখী। 
রজত অবাক হয়ে শুনলো কথাগুলো। এমন জানা মানুষ নিয়ে সংসার করা আসলেই সহজ। রজত বললো, তুমি কিসে সুখী আজকে আমাকে খুলে বলবে?
পূর্বা বললো, আমি কিসে খুশি অনেকটাই তোমার জানা। তোমার কাছে তাই আমার কোন চাওয়া নেই। তুমি আমাকে গুরুত্বে রাখো। স্বামীর থেকে স্ত্রী গুরুত্ব পেলে স্ত্রী সুখী। তুমি আমার কাছে কিছুই লুকাও না। স্বামীর সত্যতে স্ত্রী সুখী। আমার জন্য তোমার ত্যাগের সীমা নেই। স্বামীর ত্যাগ স্ত্রীর জন্য স্ত্রী সুখী না তো কি? আমাকে বিশ্বাস করো। স্বামীর বিশ্বাসে স্ত্রী যদি থাকতে পারে স্ত্রী সুখী। মেয়েদের জীবন পরাধীনতার প্রতিচ্ছবি, পরাধীনতা যেখানে আষ্টেপৃষ্টে সুখ সেখানে বহুদূর। আমাকে যথেষ্ট স্বাধীনতা দাও। স্বামীর দেয়া স্বাধীনতায় স্ত্রী সুখী। তোমার অনুভব জুড়ে থাকি আমি, বুঝতে পারি বলেই আমি সুখী। টাকা, বিত্ত-যশে আমি সুখ খুঁজি না। আমার বাবা আমাকে সেটাই শিখিয়েছে। আমিও আমার সন্তানকে সেটাই শেখাবো। ও হ্যাঁ,(?) মাতৃত্বের মহিমায় নারী সবচেয়ে সুখী। 
বলেই পূর্বা তরকারি রান্নাতে মনোনিবেশ করলো। আহা কত সুন্দর একটা মন পূর্বার। রজত কথাগুলো শুনে ঘোরের মধ্যে থাকলো। সুন্দর একটা মনের মানুষের কাছে ভালো থাকার নিশ্চয়তা থাকে। পূর্বাকে পেয়ে সে সুখী, কিন্তু কত বেশি সুখী আজ জানলো।
পরের দিন ওরা বাইরে ঘুরতে গেলো। সময় পেলেই রজত পূর্বাকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়। স্বামীর এই গুণে পূর্বা খুব খুশি হয়। স্বামী তার হাত ধরে রাখে সারাক্ষণ, বাইরে গেলে শিশুর চেয়েও বেশি আগলে রাখে তাকে। স্বামীর হাতে হাত রেখে হাটতে বড্ড ভালো লাগে তার। ভরসার হাত। এমন ভরসার হাত পেলে কে না সুখী হবে! 
ফুলের মালা কিনে রজত পূর্বার চুলে গেঁথে দিলো। আশপাশের মানুষ দেখছে, তাতে তার কোন দ্বিধা নেই। লোভ নেই লাখ টাকায়, ফুলে ভরে যার মন, তাকে আগলে রাখতে দ্বিধা কাজ করে না। ছায়ায়-মায়ায় রাখতে মন শুধুই তটস্থ থাকে। 
হঠাৎ বৃষ্টি এলো৷ বছরের প্রথম বৃষ্টি। বৃষ্টি দেখে পূর্বার মন নেচে উঠলো। হাত-পা নেড়ে বায়না ধরলো, সে বৃষ্টিতে ভিজবে। বৃষ্টিতে ভিজলে কি হতে পারে রজত জানলেও বাধা দিলো না। শখ পূরণ আগে। পরের বিপত্তি পরে মোকাবেলা করা যাবে।
বাসায় আসতে আসতে হাঁচি শুরু। রাতে জ্বর। বছরের প্রথম বৃষ্টিতে ভিজতে নেই। ভিজলেই এমন সর্দি, জ্বর আসে। একটা পুরুষ মানুষ কত সুন্দর যত্ন করতে জানে! এমন যত্ন পেলে কেউ কি অসুস্থ থাকতে পারে! এমন যত্ন করলে বন্ধনে কি বিপত্তি আসে? অন্তর জুড়ে ভালোবাসা না থাকলে এই যত্নশিল্প বুকে জন্মে না। 
পূর্বা স্বামীর হাত বুকে জড়িয়ে বললো, নারী সুখী স্বামীর এমন যত্নে!
রজত বললো, কই আমি তো জানি নারী সুখী স্টার জলসায়!
দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে হেসে দিলে।(ফেলল) পূর্বা বললো, আমি কিসে সুখী আর জানতে চাইবে না, আমি কিসে দুখী, কিসের দুখী? এমন যত্নশিল্পের শিল্পী যার স্বামী তার আর কষ্ট কিসের। 
ভীষণ রকমের ভালো লাগার আবহে ভাসতে থাকলো রজত। প্রাপ্তিরও যে শেষ আছে পূর্বাকে না পেলে ও বুঝতেও পারতো না। এমন একটা ভালোবাসার মানুষ জীবনে দেবী রূপে এসে হাজির হবে ও কখনোই ভাবেনি। নজরে রেখে রেখেও শান্তি হয় না, মনে হয় বুকে জড়িয়ে রাখবে। অনেক বেশি সৌভাগ্যবান না হলে জীবনে বিরলপ্রায় এমন সৌভাগ্যবতী আসে না। মন যেমনটা চায় তেমনটা পেতে হলে মনকেও তেমনি করে তৈরি করতে হয়। যত্ন জানা যত্নশিল্পীরা রত্নই পায়৷

অসিত কুমার পাল--নারী জীবনের সার্থকতা

অসিত কুমার পাল-- নারী জীবনের সার্থকতা ____________________ সমীরণ একটা বখে যাওয়া ছেলে, বয়স চব্বিশ পঁচিশ । তার বাবা ফুটপাতের খুচ...