শ্যামল মুখার্জী
প্রায় চললিশ বছর পর আমার নিজের গ্রামে ফেরার সুযোগটা হঠাৎ কেমন করে যেন এসে গেল। জন্ম হবার পর প্রায় উনিশ বছর এখানে কাটিয়েছি। চাকরি আর সংসার জীবনে ঢুকে এখন প্রবাসী, দেশে ফেরার আর উপায় নেই, ইচ্ছে থাকলেও, তবু জন্মভূমিকে এক মুহূর্তের জন্য ভুলতে পারিনি। প্রবল ইচ্ছা হলেও তারপর থেকে একবারের জন্য গ্রামে আসার সুযোগ ঘটেনি এর মধ্যে। পৌঁছানোর পর কাল বিলম্ব না করে একা একাই বেরিয়ে পরে ঘুরতে থাকলাম পাড়াময়, বাজারের গলিতে আর আমার স্কুলের চারধারে পাগলের মত, আমার হারিয়ে যাওয়া শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে।
ক্রমাগত হাঁটতে হাঁটতে দেহে ক্লান্তি এলেও মানসিক ক্লান্তি ছিল না। চারদিকের দৃশ্য আমার চোখের আর মনের খিদে বাড়িয়ে তুলছিল। তবু বাজারে ঢুকে এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে পড়লাম। পুরো মানচিত্রটাই পাল্টে গেছে, ছেলে বেলায় আমাদের গ্রামের বাজারে হাতে গোনা মাত্র চার পাঁচটাই দোকান ছিল আর এখন সেখানে একটা সম্পূর্ণ বাজার বসে গেছে। প্রায় সব কিছুরই দোকান হয়েছে আর ভিড়ও বেড়েছে, সেই অনুপাতে। এত পরিবর্তন হয়ে গেছে কালচক্রে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাই ভাবছিলাম। এদিক ওদিক দেখতে দেখতে হঠাৎই বাজারের মাঝখানে সেই পুরনো কালী মন্দিরটার পাশের দেওয়াল ঘেঁষে চাতালে বসে থাকা এক আধ বয়সী মহিলার দিকে চোখ পড়ল। লাল পাড় শাড়ি পরা, কপালে বড় করে সিঁদুরের টিপ, কেমন যেন চোখ বড় বড় করে উদ্ভ্রান্ত আমাকে দেখে যাচ্ছেন। কেমন যেন অপ্রকৃতিস্থ। এমনভাবে একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন কেন? নিজের মনে জিজ্ঞাসা করলাম। আমিও ওকে দেখে যাচ্ছিলাম। এমন ভাবে একজন মহিলার দিকে তাকিয়ে থাকাটা অন্যায় ভেবেও চোখ ফেরাতে পারছিলাম না কিছুতেই। ওকে দেখতে দেখতে হঠাৎ মানস পটে ভেসে উঠলো অনেক কাল আগে হারিয়ে যাওয়া একটা সরল আর কচি মুখ। আরে মৃণালিনী না? হ্যাঁ, তাইত। সেই মুখটাই তো। এখন অনেক মিল থাকলেও পোড় খাওয়া--বার্ধক্যের রূপ নিয়েছে। অপলক তাকিয়ে থাকতে থাকতে সিনেমার গল্পের ফ্ল্যাশ ব্যকের মত আমার চৈতন্য জুড়ে এক ঝাঁক পুরনো স্মৃতি ভেসে উঠলো….মনে পড়ে গেল আমার বিগত জীবনের অনেক অব্যক্ত কথা, অনেক ঘটনা, আমার হারিয়ে যাওয়া প্রথম যৌবনের প্রেম। হ্যাঁ একেই তো আমি একদিন মন -প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিলাম।
তখন আমার বয়স মাত্র ষোল কি সতেরো। মেট্রিক পরীক্ষা পাস করে সবে কলেজে ভর্তি হয়েছি। বন্ধুদের সাথে এক বিকেলে রথের মেলায় গেছি। সদ্য-প্রাপ্ত তরুণ হৃদয়। বন্ধুদের সাথে এটা ওটা কিনে খাচ্ছিলাম। আর মেলার ভিড়ে অবচেতন মনে অজান্তেই হয়তো কোন তরুণী হৃদয়ের সান্নিধ্য খুঁজছিলাম। যেটা এই বয়সন্ধি ক্ষণে প্রায়ই ঘটে। বন্ধুরা টেনে নিয়ে গেল নাগর দোলায় চড়তে। নাগরদোলায় বসে উপরে উঠার সময় আমাদের সামনের দোলনায় বসে থাকা সাদা ফ্রক পরা একটি চোদ্দ- পনে বছরের শ্যামলা রঙের সাদা-মাটা অথচ বেশ হাসিমাখা মুখের কিশোরীর দিকে চোখ পড়ল। ঠিক আজকের মত লাজুক মুখে আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। ব্যাস এই চাহনিই আমার কাল হল। প্রচন্ড ভয় হচ্ছিল আমার অথচ আমরা দুজন দুজনকে আর সবার দৃষ্টিকে বাঁচিয়ে দেখে যাচ্ছিলাম একভাবে। প্রথম প্রেমের অনুভূতি, মনে হচ্ছিল নাগরদোলা টা ঘুরেই চলুক অনন্তকাল ধরে ঠিক একইভাবে।
সন্ধ্যে হয়ে আসছিল। বাড়ি ফিরতে হবে কারণ মায়ের বকা শোনার ভয় আমার তখনও ছিল। কিন্তু মন চাইছিল না কিছুতেই ওকে ছেড়ে চলে আসতে। বন্ধুরা কেউ লক্ষ্য করেনি ব্যাপারটা। ক্ষুন্ন মনে বাড়ি ফিরছিলাম ওদের সাথে, হঠাৎ শুনতে পেলাম পেছনে কারও প্রাণখোলা মিষ্টি হাসির শব্দ। পেছনে তাকিয়ে দেখি--যাকে কল্পনা করে যাচ্ছিলাম ঠিক সেই। হয়ত আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই শুধু ওর বন্ধুদের সাথে অকারণ এই হাসি। আমার প্রথম প্রেম। বুকের মধ্যে একতাল রক্ত যেন ঝোলকে উঠেছিল লজ্জা, আনন্দ আর ভয়ের মিশ্রিত অনুভূতিতে। তারপর থেকে প্রায় বছর খানেক ধরে চলেছিল আমাদের নিবিড় আর নিঃশব্দ প্রেমের মহড়া। আমার কলেজে যাবার, বাজারে যাবার সময়গুলোকে লক্ষ্য করে ও ঠিক দাঁড়িয়ে থাকতো প্রতিদিন আমার প্রতীক্ষায়। আর আমিও ওর স্কুল থেকে ফেরার সময়টাকে আমার কলেজ থেকে ফেরার সময়ের সাথে মিলিয়ে নিতাম। কিন্তু আমি আর ও দুজনেই নিজেদের বন্ধু বান্ধবীদের ভিড়ের মাঝে পাশাপাশি হাঁটলেও ভয়ে আর লজ্জাতে কেউ কাউকে মুখ ফুটে বলতে পারিনি। লোক লজ্জা আর ভয় আমাদের দুজনকেই দূরে সরিয়ে রাখছিল। আর বলবোই বা কি করে--প্রেমের ভাষা ওই কচি বয়সে আমাদের জানা ছিল না। শুধু অনুভূতি ছিল, ভাষা ছিল না, তারপর একদিন এসেছিল সেই পরম আকাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটা। আমার কলেজ ছুটি ছিল সেই দিন। বিকেল বেলায় মায়ের ফরমাসে বাজার করে ফিরছি। নিজে অজান্তেই আমি নিজের বাড়ির রাস্তায় না গিয়ে ওদের বাড়ির দিকের ঘোরা পথে রওনা হলাম। মনে হয়েছিল ও তো ঠিক জানে আমি কোন সময় বাজার থেকে ফিরি। যদি দেখা হয়ে যায়। কিছুটা এগোতেই প্রচন্ড মুষলধারায় বৃষ্টি নামলো। ভাবলাম এত বৃষ্টিতে ও আর ঘর থেকে বেরোতে পারবে না। রাস্তায় একটাও লোক ছিল না এত বৃষ্টিতে। কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না বৃষ্টির ধোঁয়ায়। কিন্তু একি! ওই তো সেই সাদা ফ্রক পরা আমার মানসী দাঁড়িয়ে আছে ঠায় রাস্তার পাশে... আমার অপেক্ষায়। এত বৃষ্টি মাথায় করে ঠকঠক করে কাপছিল ও ঠান্ডায়। এত দিন কোন রকম চলে যাচ্ছিল একটু দেখতে পাবার আর অপ্রকাশিতও প্রেমের অনুভূতির খুশিতে কিন্তু এবার ? এত কাছে আর এক্কেবারে একা। কি বলবো ওকে? ভয়ে আর এক বুক উৎকণ্ঠায় হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ও এগিয়ে এলো আমার দিকে।
কিন্তু কিছু বলতে না পেরে হঠাৎ আমার হাতটা নিজের মুঠোর মধ্যে নিয়ে গুমড়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। আমিও হৃদয়ের আবেগকে কোন মত সংযত করে শুধু বলতে পেরেছিলাম-- '' কেঁদো না... চুপ কর... চুপ কর... কেউ দেখে ফেললে কি হবে বলতো? চলো তোমায় আমি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি... ইস বৃষ্টিতে একেবারে চুপসে গেছো'' ও কিন্তু কেঁদেই চলেছিল। আমি উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম সেদিন। হয়তো ওর সদ্য যুবতী হৃদয়ে আমার জন্য যে প্রেমের বন্যা বইছিল, তা বাকরুদ্ধ হয়ে শুধু অশ্রুধারা হয়ে নেমে আসছিল ওর চোখ থেকে। তারপর আরো পাঁচ - ছ বার ওর সাথে নিবিড় হতে পেরেছিলাম কিন্তু আমাদের কারো মুখে প্রেমের কোন ভাষার যোগান হয়নি। শুধু ''কেমন আছো ? আজ স্কুলে যাওনি?'' অথবা ''তোমার মা কেমন আছেন?'' এই সব অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তাই হয়েছিল। আমরা দুজন দুজনকে ভালবাসতে বা ভালোবাসার কথা বলতে কোনদিন পারিনি। শুধু দেখা হওয়ার ভালো লাগাটাকেই নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করতে পারতাম আমরা। হয়তো দুজনই দুজনকে ভালোবাসতে শুরু করেছিলাম কিন্তু মুখ ফুটে কেউ কাউকে কিছু বলতে পারিনি।
আর দেখা হয়নি ওর সাথে। গরিব ঘরের ছেলে আমি। সংসারের ভরণ পোষণের দায়িত্ব নিয়ে পড়াশোনা ছেড়ে চাকরির খোঁজে বিদেশে পাড়ি দিতে হয়েছিল। তারপর পেরিয়ে গেছে অনেক বসন্ত। আমি এখন বিয়ে-থা করে ছেলেপুলে নিয়ে পুরোদস্তুর সংসারী। হয়তো মৃণালিনীও তাই। জীবনে চলার গতির মাঝে ওকে মনে পড়েছে বহুবার কিন্তু দেখা করার আর সুযোগও হয়নি আর সাহসেও কুলায়নি।
আজ বহুদিন পর দুজন দুজনকে এত কাছে পেয়েও কেউ কাউকে বলতে পারলাম না,''আমি তোমাকে প্রাণ থেকে ভালোবেসে ছিলাম।'' শুধু আমার দেখা হওয়ার ভালো লাগাটাকে প্রাণ দিয়ে উপলব্ধি করে দুজনেই আমরা পেছনে তাকাতে তাকাতে সামনে এগিয়ে গেলাম।
সমাপ্ত
No comments:
Post a Comment