Showing posts with label অগ্নিশ্বর সরকার. Show all posts
Showing posts with label অগ্নিশ্বর সরকার. Show all posts

Sunday, 7 August 2022

পরিবর্তন--অগ্নিশ্বর সরকার

পরিবর্তন--
অগ্নিশ্বর সরকার

আজকের সকালটা কার মুখ দেখে শুরু হয়েছিল কে জানে! বিগত বছর দশেক ধরে কতবার ঠাকুর ডেকেছিল সৌরভ, ‘জীবনে অন্তত একবার দেখা করিয়ে দাও মুনিয়ার সাথে।’ কিন্তু সেটা আজ, এভাবে হবে সেটা কল্পনাও করতে পারেনি।

***

অফিসে কলিগ কাম পাতানো বোন শ্যামলীর বিয়েতে সপরিবারে এসেছে সৌরভ। সপরিবার মানে সৌরভ, তানিয়া আর তিন বছরের ছোট্ট আরিয়ান ওরফে বাবাই। শ্যামলীর বিয়ের লগ্ন রাত সাড়ে এগারোটার সময়। কিন্তু বিখ্যাত খড়গপুরের জ্যাম এড়ানোর জন্য বরযাত্রী সহ সৌরভরা সকলেই সন্ধ্যে ছ’টার মধ্যে চলে এসেছে। সৌরভের পিসতুতো ভাই রুদ্রর সাথে শ্যামলীর বিয়ে হচ্ছে। বিয়েবাড়ি পর্যন্ত অবধি সৌরভ এসেছে বরযাত্রী হয়ে। বিয়েবাড়িতে ঢোকার পর থেকে সৌরভ কনেপক্ষ।

বিয়ের কথা ফাইনাল হওয়ার দিন সৌরভের হাত ধরে শ্যামলীর বাবা বলে এসেছিলেন, ‘তোমার বোনকে তোমাদেরই বাড়িতে পাঠালাম। একটু দেখো বাবা। আর তুমি হাজার বরপক্ষ হলেও, বোন তোমার। তুমিই দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দেবে বাবা।’ মৃদু হেসে সম্মতি জানিয়েছিল সৌরভ।

বিয়েবাড়ি এসে দেখে কনেকে তখন সাজাতে আসেনি। এসে থেকেই শ্যামলীর পিছনে লেগেছে সৌরভ আর তানিয়া।

‘শুনেছি বিয়ের দিন উপোষ করতে হয়। তুই নির্ঘাত খেয়েছিস।’ হাসতে হাসতে সৌরভ বলল শ্যামলীকে।

শ্যামলী মুখটা বেঁকিয়ে উত্তর দিল, ‘তুই নিজে ভুক্কর, তাই পৃথিবীর সবাইকে খেতেই দেখিস। বৌদি আমাকে সেদিনই বলল তুই বিয়ের দিন দিব্যি মাটন চিবিয়ে বিয়ে করতে গেছিস।’

সৌরভ উত্তর দিল, ‘তাছাড়া আবার কী! না খেয়ে বিয়ে করার কী আছে? একজন মেয়ের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছি, তখন ভালো করে খেয়ে, শরীরে শক্তি সঞ্চয় করে যাওয়া ভালো।’

‘এখানে লেকচার না দিয়ে বৌদি আর বাবাইকে নিয়ে নিচে যা। একটু পকোড়া গিলে আয়, তাতে যদি মুখটা কিছুক্ষণ বন্ধ থাকে!’ বলল শ্যামলী।

কথাটা শুনে উঠে দাঁড়িয়ে বউ, ছেলে নিয়ে সৌরভ একতলার দিকে অগ্রসর হল।

‘দেখিস একাই সব গিলিস না। যাদের সাথে করে নিয়ে যাচ্ছিস তাদেরও একটু ভাগ দিস।’ চিৎকার করে বলল শ্যামলী।

সিঁড়ি দিয়ে নেমে পকোড়ার কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল সৌরভরা। মিনিট পনেরো ধরে প্রায় এক ডজন বড় সাইজের পকোড়া গলাধঃকরণ করে সপরিবারে একটু বাইরের দিকে ঘুরতে গেল।

ফেরার সময় পকোড়া কাউন্টারের পাশের চেয়ার দুটোতে চোখটা আটকে গেল। অনেকদিন পর দেখে গতিটা একটু শ্লথ হয়ে গেল। একজন পুরুষ আর একজন মহিলা পাশাপাশি বসে একটা প্লেট থেকে পকোড়া খাচ্ছে। সৌরভের ইচ্ছে ছিল ফেরার সময় আবারও এক প্লেট পকোড়া খাবে। সামনের দৃশ্যটা দেখে ইচ্ছেটাই তেতো হয়ে গেল। গতিপথের মাঝে বাবাই একবার বলে উঠল, ‘বাবা পকোলা খাবো।’

সৌরভ হনহন করে এগিয়ে চলল। বাবাইয়ের কথাটা শুনে সেই নর-নারী একবার তাকালো। চোখাচোখি হল কি?

 ***

বছর দশেক আগের সুরেন্দ্রনাথ কলেজ। থার্ড ইয়ারে পড়া সব থেকে কাছের দু’জন। সৌরভ আর মুনিয়া। সেই ক্লাস ইলেভেন থেকে প্রেম। একসাথে সায়েন্স নিয়ে পাশ করার পর একসাথেই কেমিস্ট্রি অনার্স নিয়ে একই কলেজে ভর্তি। গুটিসুটি প্রেম তখন থেকে একটু একটু করে ডানা মেলল। টিউশান ফেরত লুকোনো, চোরা চাউনির প্রেম এখন সোজাসুজি রাস্তাতে। অবাধ কিন্তু উৎশৃঙ্খল নয়। কলেজের ক্যান্টিনে, অফ পিরিয়ডে, কলেজ স্কোয়ারে, কফি হাউসে প্রেম বেশ খানিকটা পরিপক্ক হল। হাতের ওপর হাত রেখে কত প্রতিশ্রুতি দানা বাঁধল। ঠনঠনিয়া কালীবাড়িতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কত প্রতিজ্ঞা, কত মানত করল দু’জনে। কত রেস্টুরেন্টের কাঁটা-চামচ ছোঁয়া পেল দুজনের। সৌরভ ছিল বিরিয়ানি লাভার কিন্তু স্বাস্থ্য সচেতন মুনিয়া বিরিয়ানি মোটেও পছন্দ করত না। মুনিয়ার পছন্দ ছিল সুপ। শেষ পর্যন্ত বিরিয়ানি লাভার সৌরভ নিজেকে সুপ লাভারে বদলে ফেলল। কোল্ড ড্রিঙ্কস এখন না পসন্দ সৌরভের।

কফি হাউসে পাশাপাশি বসে কফি খাওয়ার পর সৌরভ একটা সিগারেট ধরাল।

‘তুই এবার সিগারেটটা ছাড়। খাওয়ার দিকে কন্ট্রোল করে কী হবে যদি না নেশাটা ছাড়িস! একদিকে শরীরটা গড়ছিস, একদিকে নেশা করে শরীরটা শেষ করছিস। আমি চাই তোর সাথেই বাকী জীবনটা কাটাতে। কিন্তু তুই যেভাবে সিগারেট টানছিস তাতে করে মনে হচ্ছে তোর আমার সাথে মোটেও সংসার করার ইচ্ছটাও নেই।’ মুখে একটা কপট রাগ ফুটিয়ে বলল মুনিয়া।

হাতের সিগারেটটা মেঝের ওপর আছাড় দিয়ে ফেলে মুনিয়ার দিকে তাকিয়ে সৌরভ বলল, ‘মোটেও না রাণীমা, আমি আপনার সাথেই বাকী জীবনটা কাটাবো। আমাদের একটা রাজকন্যা আর একটা  রাজপুত্তুর হবে। তাই আজ থেকেই সিগারেটের সাথে বিচ্ছেদ।’   

তারপর আছাড় খাওয়া সিগারেটটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হে সিগারেট, আজ থেকে কফি হাউসের সকলকে সাক্ষী রেখে আপনার সাথে বিচ্ছেদ ঘোষণা করছি। অনেক অসময়ের সাথী ছিলেন আপনি।

আজ থেকে আপনি চলুন আপনার পথে,

আমি রাণীর সাথে যাবো চেপে রাজরথে।’ বলেই হো হো করে হেসে উঠল।

সৌরভের হাসি দেখে মুনিয়া বলে উঠল, ‘একটু সিরিয়াস হ এবার। আর কয়েকমাস পরেই ফাইনাল পরীক্ষা। তারপর কি করবি ঠিক করেছিস? চাকরীর বাজার তো মোটেও ভালো নয়। একটু সিরিয়াস হ সোনা এবার।’

‘আমি সিরিয়াস হলে আমাকে দেখতে তোকে হাসপাতালে যেতে হবে।’ হাসতে হাসতে বলল সৌরভ।

‘অনেক ফ্লিমি ডায়ালগ দিচ্ছিস। আমি না থাকলে তোর কী হয় সেটাই দেখবো।’ মুখটা গম্ভীর করে বলল মুনিয়া।

 ***

সৌরভের একটা বড় দায়িত্ব আছে আজ, বিয়ের সময় পিঁড়ি ধরা। ঘড়িতে এখন এগারোটা। পুরুতমশাই বরকে পাশে বসিয়ে আশীর্বাদ পর্ব সেরে নিচ্ছেন। তানিয়া কিছুক্ষণ আগেই বাবাইকে নিয়ে গিয়ে খেয়ে এসেছে। সৌরভের খিদে নেই। সেই নিয়ে খোঁচা মারতে ছাড়েনি শ্যামলী। ‘খালি খেয়ে বেড়ালে আর খিদে থাকে মিস্টার ভুক্কর। আজ যদি তোর বিরিয়ানির প্লেটটা নষ্ট হয়, আমার বাবা তোকে ছাড়বে না।’

সৌরভ তানিয়া আর বাবাইকে বিয়ের মণ্ডপে বসিয়ে রেখে খাবার প্যান্ডেলের দিকে এগল। বুফে। খেতে একদমই ইচ্ছে করছে না। বিরিয়ানি খাওয়া সৌরভ সেই কলেজে পড়ার সময়-ই ছেড়ে দিয়েছে। প্লেটে একটু স্যালাড, দুটো রুমালি রুটি আর পনির নিয়ে একপাশে দাঁড়ালো। নাকে সিগারেটের গন্ধ আসতেই বিরক্তি মুখ নিয়ে পিছনে ঘুরতে আবারও সেই নর-নারীর সাথে দেখা। মুনিয়া বিয়ের পর অনেকটা মোটা হয়ে গেছে। একপ্লেট বিরিয়ানি খাচ্ছে। পাশে দাঁড়িয়ে সেই পুরুষ এক হাতে একটা আইসক্রিম আর ওপর হাতে একটা সিগারেট নিয়ে কথা বলছে।

কলেজ শেষ হওয়ার পর এক তুমুল ঝামেলার মধ্য দিয়ে সৌরভ আর মুনিয়ার প্রেমের পরিসমাপ্তি ঘটে। তারপর থেকে কেউ কারোর সাথে দেখা পর্যন্ত করার চেষ্টা করেনি। মানসিক বিপর্যস্ত সৌরভ ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়ে আইটি তে একটা চাকরি জোগাড় করেছে। ওপেনে মাস্টার্স করেছে। এখন টিমের সিনিয়ার লিডার। পথ চলতে চলতে কখন যেন সৌরভ সুপার হেলথ কন্সাস হয়ে গেছে!

আজ এইভাবে অচেনা মুনিয়ার সাথে দেখা হবে ভাবতেও পারেনি। হেলথ কন্সাস মেয়েটা নিজেকে এতো পরিবর্তন করে নেবে বুঝতেও পারেনি। সৌরভ পারেনি। আজ সৌরভের জায়গায় দাঁড়িয়ে একটা লোক মুনিয়ার এক সময়ের অপছন্দের কাজ গুলো করে যাচ্ছে, আর মুনিয়া সেগুলি সহ্য করছে। চোখটা মুনিয়ার সিঁথির কাছে ফোকাস করতে বুঝতে দেরী হল না ওই লোকটা মুনিয়ার বর, কারণ মুনিয়ার বাড়ির সকলকেই সৌরভ ভালোভাবে চেনে। পরিচিত অন্য কারোর সাথে নিশ্চয় মুনিয়া এক প্লেটে পকোড়া খাবে না? শেষে মুনিয়ার কপালে কি এই বর্বর বর ছিল!

খাবারটা আর পেটে ঢুকল না সৌরভের। সাদা প্লেটটা নামিয়ে রাখল ডাস্টবিনের মধ্যে। সৌরভ চেয়েছিল মুনিয়া সুখী হোক। রাণীর মতো থাকুক। মুনিয়ার বাহ্যিক অবস্থা দেখে পরিষ্কার বোঝা যায় সে এখন রাণী। একসাথে বাঁচার কথা দিয়ে নিজেকে পরিবর্তন করেছিল সৌরভ। আর মুনিয়া? নাকি সৌরভকে হারানোর দুঃখে নিজের পরিবর্তন ঘটিয়ে নিজেকে খুব তাড়াতাড়ি শেষ করে দিতে চাইছে? উত্তরটা সৌরভের জানা নেই।

অসিত কুমার পাল--নারী জীবনের সার্থকতা

অসিত কুমার পাল-- নারী জীবনের সার্থকতা ____________________ সমীরণ একটা বখে যাওয়া ছেলে, বয়স চব্বিশ পঁচিশ । তার বাবা ফুটপাতের খুচ...