সাবিত্রী দাস
আমাদের গতানুগতিক জীবন-যাপনের মাঝে কখনো কখনো সহসাই এসে পড়ে কোন একটা অন্য রকম দিন যেদিনটি বিশেষ ভাবে চিহ্ন রেখে যায় মনের কোণে,গভীরে গোপনে।সেদিনটি কখনো হয়তো চোখের জলে ফ্যাকাশে হয়ে ওঠা,নয়তো আবার নিরেট অশ্রুবিন্দুর মুক্তো হয়ে রয়ে যায় হৃদয় -অলিন্দে ।সেই অমলিন স্মৃতিটুকু ঝাপসা হয়না কোনদিনই।
তখন পড়তাম কলেজে।আসা যাওয়ার পথ টুকু আমরা তিন বন্ধুনী মিলে গল্প করতে করতে পেরিয়ে যেতাম অনায়াসেই।তখন মার্চ মাসের প্রথম দিকের কথা,আমরা তিনজন নিজেদের মতো করে হাঁটছিলাম কলেজের পথে।দেখি আসছে রতন,খানিক অপরিণত মস্তিষ্কের বলেই হয়তো সবাই ডাকতো রতা -পাগলা।
বাঁ হাতখানি পিছনে কিছু যেন লুকিয়ে রেখেছে।কাছে এসে হাত বাড়িয়ে দেখায় একমুঠো রক্ত পলাশ । আমাদের সবার দিকে তাকিয়ে হাসছে মিটিমিটি। আচমকা আমার হাত ধরে হাতের মধ্যে গুঁজে দিল সেই মুঠোভর্তি রক্ত-পলাশ।ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে গেলেও ,হেসে উঠেছি রতনের কান্ড দেখে।আমাদের হাসতে দেখে ওতো ভীষন খুশী!হাসতে হাসতে লাফাতে লাফাতে একেবারে দৌড়। যেতে যেতে আরও দু একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল আমাদের দিকে।পাগলের কান্ড দেখে সবাই অবাক! খানিক হাসাহাসি ও চলল বৈকি!
রতনরা এখানের পুরানো বাসিন্দা নয়, ভাড়া এসেছে বছর দেড়েক আগে।তাই ওর এই অবস্থা জন্মগত নাকি অন্য কারন তাও আমাদের জানা ছিল না।
বছর কুড়ি একুশের যুবক অথচ অপাপবিদ্ধ সারল্যে মাখা চোখ দুটি সর্বদাই মিষ্টি হাসিতে উদ্ভাসিত। সেই নিষ্পাপ মুখের অমলিন হাসিটুকু আজও চোখ বন্ধ করলে স্পষ্ট দেখতে পাই।চোখ খুললেই তো একবুক দীর্ঘশ্বাস বুক খালি করে বেরিয়ে আসে।
আমার কিশোরী মনের আঙিনার সবটুকু সেদিন রাঙা হয়ে উঠেছিল এক মুঠো পলাশের রঙে।সে রঙ সহস্র ধারায় ছড়িয়ে পড়েছিল রন্ধ্রে রন্ধ্রে,দেহের প্রতিটি তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে। সেই রক্তিম পলাশের সঙ্গে প্রথম বসন্তের আহ্বান আজও ভুলতে পারলাম না।
কালের প্রবাহে আজ রতন কোথায় আমার জানা নেই,কিন্তু তার পলাশ যে আজও আমার বুকের ভেতর রয়ে গেছে ঠিক তেমন ই। রঙে রসে সুষমা ছড়িয়ে যায় প্রতি নিয়ত।
No comments:
Post a Comment