Tuesday, 9 August 2022

অনুভব--ঊশ্রী মন্ডল

অনুভব--
ঊশ্রী মন্ডল

পুরুলিয়ার ঐ লোকগীতিটা এখনও কানে বাজে,

ওরে পুইঙ্কা ভারলি আমায়..
তোর মনে নাই বিবেচনা রে,
ওরে পুইঙ্কা ভারলি আমায়...  l

তখন যে বলিলি পুইঙ্কা ষোলো জোড়া কারা রে..
গাই গরুর লেখা ঝুকা নাই,
এ ছাগলকি ছাগল ভেরি কি ভেরি,
তোর ঘরে আইসা দেখি..
চুইট্টা ইঁদুর নাই রে ;
ওরে পুইঙ্কা ভারলি আমায়.. l 

দক্ষিণ দিকের হাওয়াটা নিলো যে তোর কোঁচাটা..
ঘরে শুইয়া দেখি পুইঙ্কা নীল গগনের তারারে,
ওরে পুইঙ্কা ভারলি আমায়..l

এর অর্থ হলো..
(ওরে পুঙ্কা আমাকে তুই ঠকালি, তখন বলেছিলি অনেক ছাগল ভেড়া আছে, কিন্তু তোর ঘরে এসে দেখি ছোট্ট ইঁদুর পযন্ত নাই l
দক্ষিণ দিকের হাওয়া এসে ধুতির কোঁচা উড়িয়ে নিয়ে গেলো, ঘরে শুয়ে দেখি নীল গগনের তারা, অথাৎ ঘরের চালও ঠিক নাই l)

    বিয়ের আগের মানুষটা বলেছিলো রেডিমেড গার্মেন্টর দোকান আছে, নিজের বাড়ি আছে, জমিজমা আছে, মনের সুখে নাচতে নাচতে মানুষটাকে বিয়ে করে ঘর বেঁধেছিলাম l
ওমা এসে দেখি সব ফুস্..মাটির ঘর, বৃষ্টি পড়লে ছাদ বেয়ে জল পড়ে, আছে বইকি অনেক জমি কিন্তু সবই শাশুড়ির নামে, যবে ওনার ইচ্ছে হবে তবেই ছেলেদের দেবেন  l স্বামীর দোকান ভালোমতো চলে না পুঁজি নেই, ভালো যোগাযোগ নেই, কতবার বললাম, ট্রেড লাইসেন্স কিংবা এক্সচেঞ্জ কার্ড দেখিয়ে ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে ব্যবসা বাড়াও, কিন্তু কানেই নিলো না আমার কথা l আসলে ও একটু ভীরু টাইপের, রিস্ক নিতে ভয় পায় l তা যা হোক, ভুল যখন হয়েই গেছে,আর কিছুই করার নাই, তাই একটু ভালো থাকার চেষ্টা করতে লাগলাম l সংসার বেড়ে উঠেছে খরচাও বেড়ে গেছে অথচ আয় সীমিত,তাই বাধ্য হয়েই দিল্লিতে চলে গেলাম, স্বামী ব্যবসা করার আগের হোটেল সার্ভিস করতেন, সেখানেই যুক্ত হলেন l

              এক চিলতে ঘর আর ছোট্ট রান্নাঘর আর কমন বাথরুম নিয়ে কোনোরকমে দিন কাটাচ্ছি স্বামী ও সন্তানের সঙ্গে l দিল্লিতে থাকার বেশ সমস্যা, ঘরের ভাড়া দিনকের দিন বেড়ে চলেছে, মকান মালিক ইচ্ছে মতো ভাড়া বাড়িয়ে চলেছে, খরচা সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে l কিছু একটা করতে হবে, স্বামীর একলা উপার্জনে ঠিকঠাক চলছেনা, কি করি, কি করি ভাবতে ভাবতে খোঁজ পেলাম সামনেই একটা ফ্যাক্টরী আছে, ফুরণ সিস্টেমে l একটা বড়ো ডাস্টার, তার চারিদিক সিলাই করে দিলে একটাকা করে দেবে, অথাৎ এক ডজনে বারো টাকা, আট ঘন্টা ডিউটি l
                    কিন্তু ঘরে কচি ছেলে, ওকে একা রেখে যাবার উপায় নেই, অগত্যা ছেলেকে বগলদাবা করে নিয়ে চললাম, কারখানার মালিকের কাছে অনুমতি নিয়ে রেখেছিলাম , ছেলেকে সাথে রাখার জন্য, কি ভেবে জানিনা উনি অনুমতি দিয়ে দিয়েছিলেন l একটা ব্যাগে দুধের বোতল, জলের বোতল, বিস্কুট, সামান্য খিচুড়ি , খান কয়েকটা কাঁথা আর জামাপ্যান্ট, কিছু খেলনাও নিয়ে নিলাম l জেগে থাকলে খেলনা নিয়ে গুড্ডু খেলতো, খাবার খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতাম, তারপর লেগে যেতাম কাজে, তা আমি দিনে সব কাজ সামলিয়ে 200 /- টাকার মতো কামিয়ে নিতাম l বিয়ে আগে সেলাই শেখেছিলাম, সেটাই এখন কাজে লাগছে l
                        যেই দেখলো আমি কামাচ্ছি, অমনি বাড়িওয়ালা বাড়িভাড়া বাড়িয়ে দিলো, মনে মনে ভাবলাম এই অন্যায় জড়জুলুম সহ্য করবো না, তাই ঘর চেঞ্জ করে নিলাম l পাশে একটাই পরিবার ভাড়া থাকে, নিশ্চিন্ত হলাম,চারিদিকটা খোলামেলা, বেশ ভালো লাগলো,খুশিতে মনটা বলল, "নে এবার জিতে গেলি l"  পাশের বাড়িতে বাঙালি পরিবার থাকে, স্বামী ও স্ত্রী l বাচ্চা চাইছে কিন্তু শারীরিক ত্রুটির কারণে বাচ্চা হচ্ছেনা,অনেক ব্যবস্থা নিচ্ছে l তা যাইহোক,ওরা আমার ছেলেকে খুব ভালোবাসে l গুড্ডু অনেকটা সময় ওদের কাছেই থাকে l
                       আজ ছুটি পেয়েছি কাজ থেকে, তাই সংসারের সব জমানো কাজ একে একে সেরে ফেললাম, ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছি l এখনও গুড্ডুকে স্নান করাতে হবে খাওয়াতে হবে, ঘুম পাড়াতে হবে, তারপর আমি নিজের জন্য কিছু করতে পারবো l পাশের বাড়ির পলি বলল, "দিদি গুড্ডু আজ আমাদের সঙ্গে খাবে, ওর জন্য রান্না করবেন না, আমিই ওকে স্নান করিয়ে খাইয়ে দেবো, ঘুমও পাড়িয়ে দেবো,ওর জন্য ভাববেন না, আপনি স্নান করে খেয়েদেয়ে একটু বিশ্রাম নিন l আমি এই লোভনীয় প্রস্তাব ঠুকরাতে পারলাম না, তাই ছেলেকে ওর কাছে ছেড়ে নিজের সব কাজ সেরে বিছানায় শুয়ে পড়লাম l
                         যথারীতি চোখ বন্ধ করার পর সেই আগের দিনের মতোই অনুভব করলাম কড়িকাঠ থেকে একটা ফাঁসির দড়ি ঝুলছে, আর কারা যেন আমাকে যেন নিঃশব্দে দেখে চলেছে l আমি চমকে  চোখ খুলে দেখি, কেও কোত্থাও নেই, মনে মনে ভাবি এইগুলি বোধহয় আমার ভ্রম, অত্যাধিক কাজের চাপ বেড়ে গেছে বোধহয় l
                 আজকেও সেই একই অবস্থা, তবে দেখি বিছানায় একটা টুল, তাতে ঐ নিঃশব্দে দেখা লোকগুলো আমাকে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে টুলে দাড় করিয়ে ঐ ফাঁসির দড়িটা আমার গলায় পরিয়ে দিচ্ছে , আমি কোনোমতেই গলায় পড়তে চাইছিনা, তবুও ওরা জড়জবরদস্তি করে পরিয়ে দিলো , কাকুতি মিনতি করে বললাম, আমায় ছেড়ে দাও, আমার ছোট্ট সন্তান আছে, কিন্তু কে কার কথা শোনে.. ওরা আমার কথা কানেই নিচ্ছেনা, প্রাণপনে চিৎকার করে উঠলাম, তোমরা কে কোথায় আছো গো,বাঁচাও আমাকে বাঁচাও l

                           একটু পড়ে  শুনতে পেলাম, গুড্ডু তারস্বরে কাঁদছে, চোখ মেলে দেখলাম, ঘরে অনেক লোক, পলি আমার চোখে মুখে জল দিচ্ছে l আমি শশব্যস্তে উঠে বসে, ছেলেকে কোলে টেনে নিলাম l
দেখলাম সকলের চোখেই অনেক জিজ্ঞাসা..
কি উত্তর দেবো.. আমিই তো কিছুই জানিনা l
পলি বলে, আপনার চিৎকার শুনে, ঘরে এসে দেখি আপনি গলায় দড়ি দিয়েছেন, আমরা সকলে মিলে কোনো রকমে আপনাকে ঐ ফাঁসি থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছি, কেন দিদি,কেন এমন করলেন.. প্লিজ খুলে বলুন আমাদের, কোনো সমস্যা থাকলে তা সমাধানের জন্য আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করবো l আপনার একটা কচি সন্তান আছে,
 ভালোমানুষ একটা স্বামী আছে, তাঁদের ছেড়ে কোথায় যাচ্ছিলেন আর কেনই বা মৃত্যুকে বরণ করছিলেন , এতো ভীরু তো নন আপনি, প্লিজ সব খুলে বলুন l
                 আমি ওদের বললাম, কোন দুঃখ্যে আমি মরতে যাবো, এরাই তো আমার সব | ওরাই তো জড়জবরদস্তি আমাকে দড়িতে ঝুলিয়ে দিলো, আমি তো চাইনি l সবাই আমাকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে দেখতে লাগলো, বলল কোথায়, কারা এই অবস্থায় তোমায় এনেছে, কাউকেই তো দেখতে পাচ্ছিনা ?
                সবাই আমাকে পাগল ভাবছে, আমার কথা কেও বিশ্বাস করছেনা,আড়ালে আবডালে আমার ভরপুর নিন্দা করতে লাগলো, আমি কোণঠাসা হয়ে পড়লাম l মানুষের সাথে চোখ তুলে কথা বলতে পারিনা, অথচ চোখ বুঝলেই তাঁদের দেখতে পেতাম, তারা এখন মুচকি মুচকি হাসে l আমি ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়তে লাগলাম  l স্বামীকে বললাম, ঘর দেখো, এ ঘর চেঞ্জ করতে হবে, অবশেষে একটা ঘর দেখে চলে এলাম l  কয়েকদিন পড় শুনলাম, ঐ ঘরে একটি পরিবার ভাড়া এসেছিলো, ঐ পরিবারের বৌটিকে পরিবারের সকলে মিলে গলায় ফাঁস লাগিয়ে মেরে ফেলে, তারপর ঐ পরিবারের লোকজন কেন জানিনা,কি ভাবে সবাই এককাট্টা মারা যায় l এরপর থেকে ঐ ঘরে কেও থাকতো না, তালা মারাই থাকতো l আমি কম পয়সার ঘরের লোভে কোনো খোঁজখবর না নিয়েই ঐ ঘরে বাস করতে গিয়েছিলাম l তাই আমার এই পরিণতি হয়েছিল l
স্বামী ও সন্তান নিয়ে এখন ভালো আছি, আর কোনো অস্বাভাবিক কিছুই দেখি না l তবে ঐ স্মৃতি মাঝে মাঝেই আমাকে বড়োই জ্বালায়, এর থেকে ছুটকারা পাবার কোনো উপায় আছে কি ? আপনাদের যদি জানা থাকে তাহলে আমাকে জানাবেন কেমন.. প্লিজ  l

No comments:

Post a Comment

অসিত কুমার পাল--নারী জীবনের সার্থকতা

অসিত কুমার পাল-- নারী জীবনের সার্থকতা ____________________ সমীরণ একটা বখে যাওয়া ছেলে, বয়স চব্বিশ পঁচিশ । তার বাবা ফুটপাতের খুচ...