ডা.অরুণ চট্টোপাধ্যায়
টিভি দেখতে দেখতে হারিয়ে গেছে সঞ্জয়। বিনোদন এমনি জিনিস। হঠাৎ একটা আর্তনাদ। না, মানুষের নয়। খুব সরু মিহি আওয়াজ।
বাড়িতে কিছু বেড়াল থাকে তার। কবে ঠিক কোন সময়ে এরা এসেছিল তা জানে না সঞ্জয়। সেই কবে কোন কালে কেউ একটা বেড়াল বাচ্চা তার বাড়ীর সামনে ফেলে গিয়েছিল হয়ত। সবে মায়ের দুধ ছাড়া কিংবা না–ছাড়া বেড়ালটা কাঁদছিল মিউ মিউ করে।
কোনও প্রাণীর কষ্ট না দেখতে পারার একটা অখ্যাতি আছে সঞ্জয়ের। সঞ্জয় তাকে খেতে দিয়েছিল – পোষে নি। তবু বেড়ালটা পোষা হয়ে গিয়েছিল তার। তারপর ক্রমান্বয়ে বংশের হাত ঘুরে ঘুরে এখন এই সাদা আর বাদামি মেশানো মেনিটা। লোকে বলে তার নাকি পোষা। কিন্তু সে ভাবে বেড়াল কি কারও পোষা হয়? কিংবা বেড়ালরা হয়ত পোষাই হয়। মানুষ বেড়াল না পুষলেও বেড়াল কিন্তু তার একটা না একটা প্রভু ঠিক ধরে নেবেই। অর্থাৎ ওরা একটা না একাটা মালিকের পোষা হয়ে যাবেই।
এই বেড়ালটার গোটা কয়েক বাচ্চা হয়েছে। বছরে দুবার করে বাচ্চা দেওয়া এদের নিয়ম। সবে মাত্র গোটা কয়েক দিন হয়েছে বয়েসের হিসেবে। তাদেরই একটার তীক্ষ্ণ আর্তনাদ। বাইরে ছুটে এল সঞ্জয়। একটা হুলো এসেছে বারান্দায়। আর এসেই বাচ্চাটার গলায় দাঁত বসিয়ে দিয়েছে।
হা হা করে হুলোটার দিকে তেড়ে গেছে সঞ্জয়। হুলোটা পালিয়েছে। কিন্তু তার আগেই যা করার করে দিয়ে গেছে। শ্বাসনালী ফুটো করে দিয়েছে বাচ্চাটার। সদ্য গলাকাটা একটা মুরগির মত মেঝেতে পড়ে ছটফট করছে আর কাতরাচ্ছে।
চোখের সামনে এই বীভৎস দৃশ্য – চোখে জল এসে গেল চল্লিশ বছরের জোয়ান সঞ্জয়েরও। সে শুধু ভাবছে এর মা-টার কথা। কি কেয়ারলেস রে বাবা। নেই এখানে। আসলে বাচ্চাটা হওয়ার সময় ছিল ছাদের ঘরে। কিন্তু আঁতুড় ঘর পালটানো বেড়ালদের স্বভাব। তাই বাচ্চাগুলোকে আবার এনে ফেলেছে এই বারান্দায়।
চিৎকারে মা বেড়ালটা এসে হাজির। কাতরাতে থাকা বাচ্চাটার মাথায় জিভ দিয়ে জোরে জোরে চেটে দিচ্ছে। সামান্য একটু হাওয়া পাবার জন্যে আকুলি বিকুলি শেষ হয়ে গেল একটু পরেই। মাত্র এক মিনিটেরও সামান্য কিছু কম সময়। স্থির হয়ে গেল বাচ্চাটার চোখের দৃষ্টি।
সঞ্জয় ভেতরে ঢুকে গেল। মনে যত কষ্টই হোক মরা বাচ্চাটাকে কোথাও ফেলে দিয়ে আসতে হবে। ব্যবস্থা কিছু নেওয়া চাই। কিন্তু ওর মায়ের সামনে তো সেটা সম্ভব নয়। মা টা মিউ মিউ করে অনবরত ডেকে ডেকে এখনও জিভ দিয়ে চাটছে বাচ্চাটাকে। ভাবছে হয়ত এমনি করে বাঁচিয়ে দিতে পারবে শিশুটাকে। বেড়ালরা মনস্তত্ত্ব না বুঝলেও বেড়ালের মন বলে নিশ্চয় কিছু আছে। কিছু মানুষ নিশ্চয় বোঝে সে কথা। বিশেষ ভাবে সঞ্জয়ের মত সেনসিটিভ লোকেরা।
ঘণ্টা খানেক পরে প্রস্তুত হয়ে এল। মরা বাচ্চাটাকে ফেলতে হবে। আর অবাক হল। সেই হুলোটা আবার ফিরে এসেছে। কড়মড় করে খাচ্ছে মরা বাচ্চাটাকে। এবার আর তাড়াল না সে। তার মনে হল এটাই হয়তো প্রকৃতির নিয়ম। ঈশ্বরের বিধানে পশুজগৎ হয়ত এমনভাবেই চলে। এই হয়ত ইকো সিস্টেম।
তিনদিন পরের কথা। বাপ্পা এসেছে মামার কাছে। বাপ্পা হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে কলেজে পড়ছে। অনেক দিন পরে এসেছে। অনেক দিনের জমা অনেক গল্প উগরে দিচ্ছে মামার কাছে।
- আমার নিজের চোখে দেখা মামা। বাপ্পা বলছিল, আমাদের ঠিক পাশের বাড়ী। তখন সন্ধ্যে বেলা। একটা খুব চিৎকার শুনে ছুটে গিয়েছিলাম। মানস কাকু মাটিতে পড়ে আছে। গলা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। আর কি যে ছটফটটা করছিল কাকু তা তোমায় কি বলব মা্মা। আমি মুরগী কাটা দেখতে পারি না একদম। তবু আমায় দেখতে হল। তাও মুরগী নয় মানুষ। পাশে দাড়িয়েছিল মোহন জেঠু। হাতে একটা খুব ধারালো ছুরি।
তখন সবাই ছুটে আসছে। এক লাফ মেরে জেঠু পালিয়ে গেল বাড়ীর বাইরে। পুলিশ আজও ধরতে পারে নি। তবে আবার শুনছি প্রমাণ তেমন নেই বলে কোর্ট নাকি বেল দিয়ে দিয়েছে।
গল্পটা তখন বেশি শুনতে পারে নি সঞ্জয়। বাপ্পাও বলতে পারে নি। কথায় বলে, নরানাং মাতুলক্রমঃ। তাই সঞ্জয়ের মতই নরম মন বাপ্পার।
সকালের গল্পটা শেষ করল দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর।
- জানো মামা মানস কাকু না ছেলেবেলা থেকে খুব অসুস্থ। পড়াশোনা কিছুই নাকি করতে পারে নি। লেখাপড়া জানে না। ওকে চাকরি দেবে কে বল? একটা কারখানায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ওর শরীর তো খুব খারাপ। ভীষণ অসুখে পড়ল। আমি ছুটির দিনে দুপুরে ওর কাছে যেতাম। কাকু দুঃখ করে বলত ওর নাকি পড়ার খুব ইচ্ছে কিন্তু কিছু মনে রাখতে পারে না অসুখের জন্যে। চিকিৎসায় সারে কি বল মামা?
সঞ্জয় যেন ধ্যানভঙ্গ হয়েছে এমনি ভাবে বলল, তা হয়ত –
- কিন্তু সে চিকিৎসায় নাকি অনেক খরচ। বাপ্পা বলল, মামা জান?
সঞ্জয় বলল, কি?
- না সে আমি তোমায় বলতে পারব না। লজ্জা করবে।
- দূর লজ্জা কিসের বল না।
খুব কুন্ঠিতভাবে বাপ্পা বলল, কাকা বলল ও নাকি একটা মেয়েকে দেখেছে তাকে বিয়ে করতে চায়। আমায় বলেছিল, বাপ্পা তোর একটা কাকিমা এলে কেমন হবে বল তো? আমি বললুম, কাকা, ভাল তো হবেই তবে কাকিমাকে খাওয়াবে কি? তুমি কি চাকরি কর?
বাপ্পা এবার খানিক থামল। সঞ্জয় বুঝল বলতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে ছেলেটার। কষ্টের মধ্যেও বাপ্পা বলল, কাকা বলল ওই তো সমস্যা রে বাপ্পা। দাদা কারখানায় একটা কাজ জুটিয়ে দিয়েছিল কিন্তু আমার বড় মাথা ঘুরত, গা পাক দিত। ডাক্তার আমাকে অনেক ভাল ভাল খেতে বলেছে জানিস?
আবার থামল বাপ্পা। আবার শুরুও করল। গলাটা বেশ ধরা ধরা, জান মামা, ওদের বাড়িতে অনেক ভাল ভাল ফল টল আসে। কিন্তু –
সঞ্জয় বলল, ওদের ভেতরের অত কথা জানতে নেই বাপ্পা।
বেশ একটু চিন্তার সঙ্গে বাপ্পা বলল, তা নেই জানি। তবে, একদিন কাকা আমার হাতদুটো ধরে কি বলেছিল জান? আমি খুব লজ্জায় পড়েছিলাম। আমার হাতদুটো আঁকড়ে ধরে একেবারে বাচ্চা ছেলের মত বলেছিল, বাপ্পা তুই তো উচ্চ মাধ্যামিক পাশ রে? কলেজে পড়ছিস। আমায় একটু পড়িয়ে দিতে পারবি না? দিলে একটু লেখাপড়ার হাল্কা কাজ একটা পাই। আমি তো ওর খাটে বসেছিলাম শেষে আমার হাঁটুদুটো ধরে – মামা ! কাকা আমার থেকে কত বড়। তোমার থেকে মাত্র তো কটা বছর ছোট। আমার লজ্জা করবে না বল?
সঞ্জয় চুপ করে ছিল। বাপ্পাকে জোরাজুরি করে নি। আর বললে বাধাও দেবে না।
- পাশের বাড়ীর সেই মানস কাকার কথা খুব মনে পড়ে মামা। ওকে নাকি আর দু’বার বিষ খাইয়ে মারবার চেষ্টা করেছিল ওর দাদা মানে মোহন জেঠু। সবাই বলছে সব সম্পত্তি এবার নাকি জেঠুর হয়ে যাবে। অনেক নাকি সম্পত্তি জান মামা? তুমি আবার বলবে ওদের ভেতরের অত কথা জানতে নেই।
No comments:
Post a Comment