বিশ্বজিৎ রায় চৌধুরী
পেট রোগা বৌটা কিছুদিন হল এ বাড়িতে ঠিকে ঝিয়ের কাজ নিয়েছে । ওর স্বামী হঠাৎ পক্ষাঘাত হয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী । জেলা সদরের হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে যে রীতিমত চিকিৎসা করবে বা কোন নার্সিংহোমে রেখে প্রচুর পয়সা খরচ করে চিকিৎসা করবে সেই ক্ষমতা ওর নেই । ওর স্বামী মানিক এমনিতে ভালমানুষ । মুনলাইট ডেকরেটরে কাজ করে । কাজ হরেক রকম । কিন্তু সম্প্রতি বাঁ পায়ের শিরায় উরুর জায়গায় টান ধরতে শুরু করে । সামনে বাসন্তী পূজো । অর্ডার ও কম নয় । একটানা প্যান্ডেল বাঁধা , লাইটিং , সাউন্ড সিস্টেমের কাজ । তারপর ক্রমাগত ওপর নিচ করতে করতে শিরায় টান লেগে , তারপর বাঁ পায়ের খিল বসে গিয়ে অসাড় ।
স্থানীয় হেল্থ সেন্টারে এখন যথেষ্ট ভাল চিকিৎসা হয় । মানিককে দেখে ডাক্তার বলেছেন এর কলকাতায় চিকিৎসা আছে । প্রচুর টাকা ঢালতে পারলে হয়তো ওর পায়ের সাড় ফিরিয়ে আনা সম্ভব । তাড়াতাড়ি করতে হবে । কিন্তু কিভাবে হবে ? ভেবে পায় না মানিকের বৌ ।
ঠিকে ঝিয়ের কাজ নিয়েছে বি . ডি . ও . স্যার রথীন্দ্রনাথ মন্ডলের কোয়ার্টারে । এটা নীলিমার ভাগ্যই বলতে হবে । একটা আপ্তবাক্য নীলিমা মনে মনে গভীরভাবে বিশ্বাস করে । যখন ঈশ্বর সৌভাগ্যের সব দরজাগুলো বন্ধ দেখেন তখন একটিমাত্র দরজা খুলে রাখেন । প্রত্যেক মানুষের জন্যে একটা , অন্ততঃ একটা সৌভাগ্যের দরজা খোলা থাকে । নীলিমার দিক থেকে বি. ডি . ও. রথীন্দ্রনাথ মন্ডলের কাছে দিন কুড়ি আগে ঠিক হওয়া ঠিকে কাজের চাকরিটা যেন শাপে বর হয়েছে । আজকাল স্বাস্থ্য সাথী কার্ড দেখিয়ে পাঁচ লাখ টাকা মূল্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়া যায় সরকারের কাছ থেকে । তবে উপযুক্ত অনুমোদিত হাসপাতাল বা নার্সিং হোম দেখে মানিকের প্যারালিসিসের চিকিৎসা করতে ও স্বাস্থ্য বীমার সুবিধা নিতে গেলে বি. ডি. ও. স্যার পরিত্রাতার ভুমিকা নিলেন , এটাই নীলিমার জন্য ভগবানের খোলা দরজা । মানিকের যখন শিরা টান ধরে ক্রমশঃ অবশ হয়ে আসছে তখনও নীলিমা কাজে ঢোকেনি । হঠাৎ বি. ডি. ও. বদলে নতুন বি. ডি . ও. এসেই ঠিকে ঝি রাখতে চাইলেন আর খবরটা নীলিমার কাছে এসে পৌঁছল , তাই রক্ষা ।
নতুন বি. ডি. ও. প্রথমেই এসে জনসেবা করার এমন সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলেন না । নীলিমার বয়েসও বেশি নয় । পঁচিশ ছাব্বিশ হয়তো হবে । আর মানিকের বত্রিশ তেত্রিশ । ওদের ছেলেমেয়ে এখনও হয়নি । সুতরাং নীলিমার স্বামী মানিককে স্বাস্থ্যসাথীর কার্ডের মাধ্যমে কলকাতার নামী নার্সিংহোমে রেখে চিকিৎসার সুযোগ করেদিলেন বি . ডি . ও . রথীন্দ্রনাথ ।
আর নীলিমাকে কাছে রেখে হোমটাস্ক দিলেন । নীলিমা এতটা সহায়তা আশা করেনি । কিন্তু ঈশ্বর যখন কারোর দিকে পূর্ণ ভালবাসার দৃষ্টি মেলে ধরেন তখন স্বয়ং যমরাজও শিয়রের শমন জারি করেও নিতে পারেন না পরোয়ানা জারি করা মৃত্যু পথযাত্রীকে । কথায় একে বলে রাখে হরি মারে কে ?
এই নীলিমা কোথায় হারিয়ে যেত , জীবন থেকে হারিয়ে যেত চিরদিনের মত , কিন্তু রথীন্দ্রনাথ মন্ডলের মত শিডিউল কাস্ট অন্তর্ভুক্ত হৃদয় জাতে নীচু মানুষের মন এত উঁচু তা মানিকের চিকিৎসার সুযোগ পাইয়ে দেবার তদ্বির থেকেই প্রতিপন্ন হয় ।
মানিক দেড় মাসের মত নার্সিংহোমে চিকিৎসাধীন ছিল । এই দেড় মাস নীলিমার দিনরাত্রি গুলো রথীন্দ্রনাথ শুধু ঠিকে ঝিয়ের কাজের অন্তরালে নিজের তত্ত্বাবধানে রাখতে চেয়েছিলেন । কিন্তু নীলিমা মাত্র দেড়মাসের জন্যে কাজের লোক হতে পছন্দ করল না । এই অপরিশোধ্য ঋণের জন্য মানিক সেরে উঠে নীলিমাকে বরাবরের জন্য রথীন্দ্রনাথের কাছে কাজে বহাল করে দিল । এমন বিশ্বাসী লোকই চাকরি জীবনে রথীন্দ্রনাথকে অটুট সহায়তা দিল । কারন তিনি তো আজীবন অবিবাহিত ।
নীলিমার দিনরাত্রির সঙ্গী তিনি । মানিকেরও পরম বন্ধু । কথায় বলে , মেলাবেন তিনি মেলাবেন ।
No comments:
Post a Comment