Sunday, 7 August 2022

পথের ভাইয়ের ঘরে ফেরার গল্প !--শুভ্রা ভট্টাচার্য


পথের ভাইয়ের ঘরে ফেরার গল্প !--শুভ্রা ভট্টাচার্য 

সামাজিক ভালো কাজকর্মে আমার বেশ আগ্রহ থাকার কারণে হঠাৎ খবর এলো এক বয়স্ক মানুষ বেশ কিছুদিন ধরে স্টেশন চত্বরে একা বসে আছেন। ব্যক্তিটি কারু সাথে কথা বলেন না, নিজের খেয়ালে ডুবে থাকেন। কেউ কিছু দিলে খান না হলে উপবাস। খবরটি পেয়ে আমাদের অন্তরবীক্ষন টীমের পক্ষ থেকে ছাত্র অভিজিৎকে সাথে নিয়ে ২৪ জুলাই তারিখ ছুটলাম চুঁচুড়া স্টেশনে। সেখানে তাকে বিভিন্ন ভাবে সহায়তা দিতে চাইলে তিনি তা নিজে নিতে অস্বীকার করলেও আমাদের সাথে স্টেশনে পড়ে থাকা একটি বছর ৪০ এর ছেলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন "আমাকে নয়, ওকে একটু হেল্প করুন, খেতে পায় না ভালো করে সে।" ছেলেটিকে দেখেই মনে এক অদ্ভুত ভালো লাগার আবেশ অনুভূত হয়, হাসিটি বড়ো সরল আর খুব শান্ত স্নিগ্ধ সাদাসিধে এক অকৃত্রিম চেহারা। আমরা ছেলেটির সাথে এটা ওটা কথা বলে আলাপচারিতার মাধ্যমে প্রথমে একটু ভাব জমাবার চেষ্টা করি। কিছু খাবার কিনে দিই রাতের মতো আর পাশের একটি দোকানে ওকে রোজ খাবার দেওয়ার জন্য টাকা অ্যাডভান্স করে দিই। কথায় কথায় ওর বিষয়ে খোঁজ নিতেও শুরু করি। সে অল্প কথার ফাঁকে টুকটাক উত্তর দিলেও নিজের নাম ঠিকানা ও বাড়ির লোকজনের নাম কিছুতেই বলতে চাইলো না। উদাস নয়নে বললো "আমি ভুলে গেছি সব কিছুই মনে পড়ছে না আমার!" তাতে বেশ কিছুটা অবাক হলাম। বুঝলাম মাথার কিছুটা সমস্যা আছে। পাশাপাশি লোকজনের থেকে জানলাম আত্মসম্মানবোধ এতো বেশি যে কারু কাছে চেয়ে খেতে পারে না, যে যা দেয় তাতেই খুশি। এতেই বুঝলাম ভালো ঘরের লেখাপড়া জানা ছেলে, কোনো ভাবে পথ হারিয়ে স্টেশনে পড়ে আছে, তাই এর স্থান কিছুতেই এই স্টেশন হতে পারে না! পরম স্নেহে বললাম "তোমাকে কোনো হোম বা আশ্রমে রাখলে থাকবে তুমি?" সে খুব খুশি হয়ে সম্মতি জানালো। 
তারপর আবারও কয়েকবার গেলাম ওর সাথে দেখা করতে। খাবার জামাকাপড় ও প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস পত্র দেওয়ার পর আবার নতুন উপায়ে অনুসন্ধান শুরু করলাম। নানা ভাবে প্রশ্ন কাগজে লিখে বা কথার ফাঁকে এটা ওটা জানার মাঝে বাড়ির লোকজন ও নাম ঠিকানা জানতে চাইলাম। দেখি সব প্রশ্নের গুছিয়ে খুব সুন্দর উত্তর দেয়, শুধু নাম ও ঠিকানা বাদে! অবশেষে হাম রেডিওর কর্ণধার অম্বরিশবাবুর সাথে যোগাযোগ করলাম, সদর SDO সাহেব সৈকত গাঙ্গুলির সাথে ওর বিষয় নিয়ে কথা বললাম। উনারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। অম্বরীশবাবু বললেন "ছেলেটি ইচ্ছে করে নাম বলছে না, ওকে অন্যভাবে কায়দা করে সব জানার চেষ্টা করুন।" অবশেষে এক মোক্ষম বুদ্ধি বের করে ৩০ শে জুলাই অনেকটা সময় ওকে দিয়ে অনেক কায়দায় আমি আর অভিজিৎ ওর নাম ঠিকানা অবশেষে বের করতে সক্ষম হলাম। কিন্তু এটা বুঝলাম যে বাড়িতে এমন কোনো ঘটনা আছে যার জন্য ও বাড়ি ফিরে যেতে চায় না। তাই হয়তো আগে যতবার জানতে চেয়েছি ততবার নিজের নাম ঠিকানা লুকিয়েছিল। শুধু বারবার বলে "আমাকে একটা আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিতে পারেন!"
নাম জানলাম দীপঙ্কর হাজরা, বাড়ি - মহেশতলা, গার্ডেনরিচ। দিদি ভাইয়ের সম্পর্ক পাতিয়ে যখন পূর্ণ বিশ্বাস অর্জন করলাম তখন সে কতদিন ভাত না খাওয়ার কথা জানালো। শুনে ভীষন কষ্টে বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। তৎক্ষণাৎ খোঁজ নিয়ে একটু দূরে একটা হোটেল আবিষ্কার করে ওকে সেখানে ভাত খাওয়াতে নিয়ে গেলাম। তিনদিনের ভাতের টাকা অ্যাডভান্স দিয়ে এলাম হোটেলে আর দুপুরে গিয়ে রোজ খেয়ে আসতে বললাম।  সকাল থেকে কিছু খাই নি মনে হওয়ায় কেক পাউরুটি আর একটা ক্যাডবেরি কিনে দিয়ে এলাম।
ভালোবাসার তুল্য মহান সম্পদ আর বুঝি কিছু নেই এই বিশ্ব চরাচরে, আর সেটা ধনী দরিদ্র পাগল নির্বিশেষে সবার জন্য প্রযোজ্য। তাইতো আগের দিন বেশ কিছু জামা প্যান্ট ও সাবান দিয়ে বলে এসেছিলাম"সাবান দিয়ে চান করে জামা প্যান্ট পাল্টাবে।" কথা রেখেছিল ভাই, স্নান করে আমাদের দেওয়া জামা প্যান্ট পরেছিল। স্নেহের কথার মূল্য বোঝায় ভীষণ খুশির হাওয়া লেগেছিল প্রাণে। 
অবশেষে আমাদের দেওয়া নাম ঠিকানা পেয়ে হাম রেডিও দীপঙ্করের বাড়ির লোকজনকে খুঁজে পেতে খুব তৎপর হয়ে উঠে। তারপর এক বিকালে ওরা জানালেন দাদা সোমনাথ ও বৌদি আসছেন ছেলেটিকে বাড়ি ফিরিয়ে নিতে। দাদারা পুলিশ বাহিনী নিয়ে রাত দশটায় এলেন। পুরো দুই বছর পর ভাইকে ফিরে পেয়ে আমাদের প্রতি অনেক কৃতজ্ঞতা জানালেন দাদা। বললেন "চাকরি না পেয়ে হতাশ ভাই বেশ কিছুদিন ধরেই মানসিক অবসাদে ভুগছিল, আর সেই কারণেই হঠাৎ কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। আর ছেলের শোকে মা বিছানায় প্রায়।" আমরা উনার ভাইয়ের মেন্টাল চিকিৎসার সহায়তা দিতে চাই জানিয়ে আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখতে বললাম। রাতে বিরিয়ানি খাওয়ার পর ট্রেন ধরে বাড়ি ফিরে গেলো দাদা বৌদির সাথে দীপঙ্কর। ওদের ট্রেনে তুলে দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে চোখের কোনটা হঠাৎ ঝাপসা হয়ে গেলো। হয়তো বা ভালোবাসার টানে কিংবা ঘরের ছেলে ঘরে মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ায় অনন্য এক ভালো লাগার অনুভূতিতে! এমন এক অদ্ভূত খুশি প্রাণে মনে আলোড়িত যার মূল্য পৃথিবীর কোনো বস্তুগত জিনিস দিতে পারবে না।
তবে এদের মতো অসহায় সরল মানুষগুলোকে পথে পড়ে থাকতে দেখে আমাকে একটা ভাবনা সর্বদা তাড়া করে বেড়ায় "যদি এই মানসিক ভারসাম্যহীন পথের মানুষগুলোর জন্য একটা নিরাপদ আশ্রয় বানিয়ে মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারতাম!!"

No comments:

Post a Comment

অসিত কুমার পাল--নারী জীবনের সার্থকতা

অসিত কুমার পাল-- নারী জীবনের সার্থকতা ____________________ সমীরণ একটা বখে যাওয়া ছেলে, বয়স চব্বিশ পঁচিশ । তার বাবা ফুটপাতের খুচ...