Sunday, 7 August 2022

আসমানদারী--শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার


আসমানদারী--শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার

আজ একটা আবার একটা সকাল। কিন্তু নতুন কিছুর উজ্জীবন নয় মোটেও। সেই কালকের বাসি পাঁউরুটি আর ঝিম্ ধরা গ্লাসে ধোঁয়া ওঠা চা। আজ তিনদিন হল খদ্দের নেবেনা মালা। যদিও আজ বিকেল গড়ালে রক্ত পড়াটা একটু কমবে তাও ওর তলপেটে, কুঁচকিতে বড্ড ব‍্যথা। এসময়টা এমন হয়। হলে খুব রাগ হয়! খুব! প্রতিমাসে এই কষ্টটা না পেলেই কি হতনা। যখন ওর বাড়ি ছিল, ঠিকানা ছিল, আর মা ছিল! তখন নুনের পুঁটলি গরম করে তলপেটে কোনো কোনো রাত্তিরে মা ঠিক সেঁক দিয়ে দিত। পরিতৃপ্তি আর আদরে তখন ঘুম পেত!.... হ‍্যাঁ! ঘুম পেত!

আজকের মত দিনে দু'জন অচেনা পুরুষের সাথে নকল নাটকের শেষ অঙ্কের পর ঘুম'কে তোয়াজ করে  আনতে হতনা।
তখন " ঘুম "  আসত। ঠিক আসত।
...........

ছাপছাপ পোশাকের  এমন ফকির কেউ এ তল্লাটে আগে দেখেনি। লোকটার মুখে অমায়িক হাসি আর গলায় আছে গানের কলি।" মুস্কিল আসান" এর একটা  মাটীর পিদিম জ্বালিয়ে লোকটা বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভিক্ষে চায়। ঠিক চায়ও না।

তবে মেয়ে-বউরা ওকে ভালবেসে গুড়-মুড়ি বা পান্তা মেখে এনে দেয়। লোকটা হাসিমুখে নিয়েও নেয় আর তারপরে পেট ভরে গেলে সালামৎ এর দরিয়ার হদিস দিতে দিতে সুর ভাঁজে। গ্রামের লোকেরা তাকে যে সবাই এটা ওটা দেয় তেমন নয়।

কিছু দিলে বা না দিলেও মর্জি হলে লোকটা আসমানদারীর গানে গলা মেলায়। এই আজব কারখানায় সে যেন নিছক বেড়াতেই এসেছে। কোন দায় নেই, চাহিদা নেই, এমনকি দাতা-গ‍্রহীতা সম্পর্কও নেই কারো সাথে। সে খুশী হলে যেমন গেয়ে ওঠে আবার দুঃখের অতলেও সে পাড়ি দেয় সুরের কারবারটিকে ধরে। সে যেন ঠিক গানও গায়না। সে আসলে  নিজেই একটা  গান হয়ে ছড়িয়ে পড়ে মাঠে-বনে-গৃহস্থলীতে কিংবা প্রান্তরে।
...........

পাশের ঘরের রমা আর মালতী টাইমকলে জল ভরতে ভরতে খেউড় করে এ ওর গায়ে ঢলে পড়ছিল।

কাল কার্তিক পূজো বলে এই অসময়ের হাসি মশকরা। এপাড়ায় ল‍্যাংটো কার্তিকের পুজো হয়। নগ্নতা বোধহয়  একমাত্র একদিনই এপাড়ায় অপত‍্যের দাবী মেনে সব মেয়েছেলেদের জন‍্য সম্মানটুকু পায়। নইলে ওদের মত জঞ্জালদের জন‍্য আবার সোহাগ!

মালা অতিকষ্টে বাইরে আসে। পেটের ব‍্যাথাটা যেন একটু কমলো। আর কিছুক্ষণ পর থেকেই দরজায় টোকা পড়বে তার  সাথে  ধেয়ে আসবে মাসি'র ঝাঁঝালো বিশেষণ আর মাতালদের জড়ানো গলায় আদিরসের ফোয়ারা।

আচ্ছা! তখন ওদের মত কেউ  কি তাদের  ফেলে আসা টিউবকল আর হারিয়ে  যাওয়া  বাড়ির অন্দরের কথাগুলোকে  ভাববে? কিংবা আজন্মের স্নেহ, মায়ার কাজললতার কথা? মনে তো হয়না!

মালা অবশ‍্য এই কয়েকবছরে বেশ বুঝে গেছে যে শুধু সে কেন আর কেউই এজন্মের কোনকিছুরই ঠিক মালকিন নয়। এমনকি ওদের মুখরা মাসিটাও মালকিন নয়।

সবকিছুর আসলে  একজনই মালিক বা মালকিন। তাঁকে কেউ কখনো না দেখলেও তিনি কিন্তু বোঝেন দুনিয়াদারীর সবার সব রকমসকম।

চাঁদ-সূয‍্যির মত পালঙ্কে বসে সেই মালিক বা মালকিন রোজ ওপর থেকে সব  খালি চেয়ে চেয়ে সব দেখেন  আর সময়ের সাথে বসে বসে আশনাই করেন।

আসলে তেনার কাছে তো আসমান -জমিন সব বরাবর! মানে এক। সেখানে কে যে কবে কোথা থেকে আসছে আবার  কে যে কোথায় হঠাৎ মিলিয়ে যাচ্ছে, তার কে-ই বা ঠিক করে বলতে পেরেছে।

নাহ্! কেউ বলতে পারেনি আর  বলতে পারবেও না।
.........

ফকির এবারে একটা ভাঙ্গা পোড়ো ঘরের ধ্বংসস্তুপ থেকে হাসতে হাসতে বেরিয়ে এল।

ও কিন্তু  জানে এই বাড়ির পুব দিকে একটা পুকুর আছে। তা এখন অবশ‍্য পানায় ঢেকে গেছে। তবে এককালে একটা গোয়ালও ছিল একপাশে। আজ আর কিচ্ছুটি নেই। সব যেন হুস্ করে  কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে।

দরমার বেড়ার পাশটাতে একটা উঁচু ধাপি মতন জায়গায় এখন বেশ  জঙ্গুলে ঝোপ গজিয়েছে। ফকির কি ভেবে  ওখানের মাটিটাকে  একটু শুঁকলো আর তারপরে একটুখানি খুঁড়লো। ভাগ‍্যিস ওকে এখন আর কেউ দেখছেনা! নৈলে ওকে ঠিক পাগল ঠাউরাতো।

গর্তটা থেকে একটা মরচে পড়া টিনের নস‍্যির কৌটো বেরুলো। কবেকার জিনিস কে জানে?

একমুখ হেসে ফকির কৌটোটার মধ‍্যে হাত ঢুকিয়ে ছোট্ট ছোট্ট দুটো মলিন দুধে দাঁতের খন্ড বের করে দেখতে লাগল। তখন যেন  ওর  কানে কোত্থেকে আসা দু'কলি সুর এসে বলছিল,

" কলাবতী মা আমার...দু'কান খুলে শোনো...চাপা রইল দুধের আগা...দিও আবার পুনঃ....দিও আবার পুনঃ......"
......

আসলে একেকটা অতীত ঠিক যেন ভোলবদলে চারপাশে এসে রয়েই যায়। শুধু তাকে কেবল সময়মতন খুঁজে দেখতে হয়।
হেমন্তের মিঠেকড়া রোদ্দুরে স্নান করতে করতে ফকির হাসিমুখে এবার গেয়ে উঠল ,

" পরের জায়গা পরের জমিন
ঘর বানাইয়া আমি রই,
আমি তো সেই ঘরের মালিক নই
আমি তো সেই ঘরের মালিক নই।।

সেই ঘরখানা যার জমিদারি
আমি পাইনা তাহার হুকুমজারী,
সেই ঘরখানা যার জমিদারি
আমি পাইনা তাহার হুকুমজারী,.

আমি পাইনা জমিদারের দেখা
পাইনা জমিদারের দেখা
আমি পাইনা জমিদারের দেখা,

মনের দুঃখ কারে কই
আমি মনের দুঃখ কারে কই।
আমি তো সেই ঘরের মালিক নই,

পরের জায়গা পরের জমিন
ঘর বানাইয়া আমি রই,
আমি তো সেই ঘরের মালিক নই
আমি তো সেই ঘরের মালিক নই।।"

....এখন মনে হচ্ছে যেন এই সুরটা বোধহয়  সময়ের ওপারে গিয়েও ঠিক একইরকমভাবে থেকে যাবে।

আর নিয়ম মেনে ভোলবদলে সেই সুর গঞ্জের ওইসব  পাড়ায় -
" ওওও জোছোনা...করে এএএএছেএএএএ আআআড়িইই আআসেনাআআ আআমাআআর বাআআআড়ীঈঈঈ" র মতন  একটা মনখারাপী  কথার সাজ মেখে কেবল  ভেসে বেড়াবে।

কে জানে? তখনও কি অতীতগুলোকে কেউ চিনতে পারবে কি?

না চেনার দরকার নেই....

খালি ফকির  অবশ‍্য জানে যে এটাই  হল  আসমানদারীর আসল মজা!

............

No comments:

Post a Comment

অসিত কুমার পাল--নারী জীবনের সার্থকতা

অসিত কুমার পাল-- নারী জীবনের সার্থকতা ____________________ সমীরণ একটা বখে যাওয়া ছেলে, বয়স চব্বিশ পঁচিশ । তার বাবা ফুটপাতের খুচ...