______________________
গার্গী এই বাঞ্জী শব্দটা শুনতে শুনতে তার নিজের প্রতি বিশ্বাসটাই যেন হারিয়ে গেছিল!
মা না হওয়ার সমস্ত দায়টাই যেন সমাজ চাপিয়ে দিয়েছিল গার্গীর উপরেই।
এক এবং একমাত্র শুধু গার্গীর উপরেই!
বিয়ের তেরো বছর পরে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কটা হয়ে উঠেছিল একটা লোক দেখানো সামাজিকতার মতো!
শুধু বাড়িতে একটা সন্তান না থাকার কারণে তার আর তার স্বামীর মধ্যেকার মানসিক দূরত্ব যে কয়েক হাজার আলোকবর্ষ কিলোমিটার হয়ে যেতে পারে তা গার্গী স্বপ্নেও ভাবতেই পারেনি!
ওরা কিন্তু একদিন প্রেম করেই বিয়ে করেছিল।
এমনকি গার্গীর পরিবার এই বিয়ে মেনে নিয়েছিল বহুদিন পর।
তবু বিয়ের তেরো বছর পরে এখন একই বিছানায় দুইজনের দূরত্ব মনে হয়ে কিলোমিটার খানেক!
আর মনের দূরত্ব বোধহয় এক আলোকবর্ষ!
গোটা পাড়া একসময় তাদের ভালোবাসা দেখে রোমিও-জুলিয়েট নামেই ফিসফিস করত।
পাড়ার মেয়ে বৌ রা পর্যন্ত ঠাট্টা করত।
বাড়ি পাড়া মাত করতো দুইজনে কথা, আড্ডা আর গানে।
সকলের সম্মুখে অজয়কে জড়িয়ে ধরতেও কুণ্ঠিত বোধ করত না গার্গী।
আর এখন?
শুধুই নীরবতা আর পড়ে থাকে জোরে নিঃশ্বাস ছাড়ার শব্দ!
কথা হয়, কিন্তু তা শুধুমাত্র সাংসারিক প্রয়োজনেই।
কোনো কোনো দিন তো দুজনের মধ্যে একটাও কথা হয় না!
গার্গীর স্বামী অজয় সারাদিনে দুইবার বাড়িতে আসে!
একবার দুপুরে, আরেকবার সন্ধ্যে নামার ঠিক আগে।
রাত্রিতে ঠিক নেই!
কোনোদিন আসে, কোনোদিন আসেও না!
গার্গী বহুবার ডাক্তারের কাছে যেতে বলেছিল অজয়কে।
অজয় যায় নি।
পরোক্ষে বুঝিয়েই দিয়েছিল মা না হবার সবটার দায় যেন একা গার্গীই!
গার্গীর প্রতিবেশীরা সহ অনেকেই পরোক্ষভাবে সবসময় আকার ইঙ্গিতে বাঞ্জি ঠেস দিয়েই কথা বলে!
পাড়ার শুভ কাজে-পুজোতে গার্গী আরও একা!
সে যেন তখন সাক্ষাত্ অচ্ছুত!
পাড়ার শুভ কাজে গার্গীর প্রবেশ প্রায় নিষিদ্ধ!
প্রতিবেশীর বিয়েতে চালুন বা ঘট ধরার অধিকার ছিল না গার্গীর!
যেন সে ডাইনি-অপয়া!
অগত্যা পুজো আনন্দ অনুষ্ঠানের দিনগুলোতে সে স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি করে রাখে নিজেকে!
গ্রামের বিকেলের পাড়ার বৌ-বোনেদের আড্ডায় গার্গী সেই কবে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল!
এই বাঞ্জি শব্দ শুনতে শুনতে সে পাথর হয়ে গেছে!
একমাত্র আয়না ছাড়া গার্গীর দুঃখ কষ্ট অভিমান ভাগ করে নেবার কেউ নেই!
অজয়ও দিনকে দিন বোবা পাথরে পরিণত হয়েছে।
দুই জন যতক্ষণ একসাথে থাকে কথা হয় সামান্যই!
গার্গী এই কষ্টের কথা বার কয়েক অজয়কে বলার চেষ্টা করেছিল!
অজয় শুনত না!
গার্গীর সমস্ত রাগটাই ছিলো অজয়ের উপর!
গার্গী সারাক্ষণ ভাবত--
"দায়ীটা কে?
অজয় কেন একবারও নিজের পরীক্ষা করালো না?
অন্যের দোষে তাকে একা কেন বহন করতে হবে?"
সত্যি বলতে অজয় আর গার্গী দুজনেই মনে মনে একে অপরকে দোষী সাব্যস্ত করে ফেলেছিল।
গার্গীর সহ্যের সীমা যেদিন পার হলো,
গার্গী পণ করলো তাকে এবার মা হতেই হবে।
যেনতেন প্রকারেই মা হতে হবে।
এই অবিচারের জবাব তাকে দিতেই হবে।
আর সেদিন থেকে বিছানায় শয্যাসঙ্গী হলো অজয়ের এক বন্ধু।
অজয়ের দুটো বাড়ি পরেই এই বন্ধু দিলীপের বাড়ি।
তারপরেও গার্গীর পেটে সন্তান এল না!
চুপি চুপি ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল আরও কয়েকবার।
শেষমেষ জানা গেল গার্গীর একটি শারীরিক ত্রুটির জন্যই সে কখনো মা হতে পারবে না!
এইদিকে দিলীপ প্রায় প্রতি দিনই গার্গীর কাছে আসে।
গার্গী যে কারণে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল দিলীপের কাছে, ডাক্তারি রিপোর্ট জানার পর সে দিলীপকে এড়ানোর চেষ্টা করত।
দিলীপ প্রায় জোর করেই গার্গীকে বাধ্য করত!
সে আর মানসিক ভাবে দিলীপের সঙ্গ নিতে পারছিল না!
এরই মধ্যে অজয় সেই রাতে বাড়ি ফিরে গার্গীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে।
বিগত কয়েক বছরের তার এই ব্যবহারের জন্য সে সত্যিই অনুতপ্ত!
ক্ষমা চাইতে থাকে গার্গীর কাছে!
অনুরোধ করতে থাকে বাড়ি বিক্রি করে এই পাড়া ছেড়ে অনেকদূর চলে যাবে তাকে নিয়ে।
সেখানে গিয়ে একটা সন্তান দত্তক নেবে।
গার্গী ছাড়া পৃথিবীতে আর কাউকে কোনোদিন সে এতটা ভালোবাসেনি এই কথা বলতে থাকে,
আর কাঁদতে থাকে,
আর ক্ষমা চাইতেই থাকে।
গার্গী নির্বাক হয়ে অজয়ের বুকে মাথা রেখে কেঁদেই চলেছে!
গার্গী সেই রাতে বিয়ের প্রথম রাতের মতো অজয়কে আবার ভালোবেসেছিল।
নিজেকে আবার অজয়ের কাছে উজাড় করে দিয়েছিল।
ঠিক প্রথম রাতের মতোই।
পরদিন সকালে অজয় চোখ খুলতেই দেখে গার্গী ফ্যানের সাথে ঝুলছে!
বালিশের পাশে একটা চিরকুট!
তাতে লেখা--
"বড্ড দেরী করে ফেললে অজয়!
আমি নিজেকে নষ্ট করে ফেলেছি!
বাঞ্জি দের যে কোনো দেশ নেই, পাড়া নেই, পৃথিবী নেই!
বাঞ্জি দের যে বেঁচে থাকতেই নেই!"
বিশ্বজিৎ প্রামাণিক
পতিরাম,দঃদিনাজপুর
No comments:
Post a Comment