স্বপ্ন ঘর--
সান্ত্বনা চ্যাটার্জি
সামনেই হাওয়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা।আমি একতলার কাকাবাবুর ল্যাবে বসে অঙ্ক করছিলাম। রাত বারটাবেজে গেছে, কাকাবাবু শুতে চলে গেছেন।যাবার আগে মাথায় এক চাঁটি মেরে বলে গেছেন সব কটা অঙ্ক শেষকরে শুতে যাবি।ডিসেম্বরের রাত, হাড কাঁপান শীত পরেছে। আমি সোয়েটারের ওপর চাদর মুরি দিয়ে অংককরছি হঠাৎ মনে হল কে যেন আমার চুলে আঙুল দিয়ে বিলি কাটছে।চমকে পিছন ফিরে দেখি একটা নয় দশবছরের মেয়ে পিছনে দাঁডিয়ে।
এ্যায় কে রে তুই। এতো রাতে এখানে কি করছিস?
মেয়েটা ঠোঁট উল্টে বলল এ আবার কি আমাকে চিনতে পারছিস না? আমি তো তোর রমাদি।
ইয়ার্কি হচ্ছে !ও রামুকাকা এখানে এসো তো, দেখ কে এই মেয়েটা।
ঘুমন্ত ঢুলু ঢুলু চোখে রামুকাকা এসে হাজির। কি হয়েছে খোকাবাবু এত রাতে ডাকা ডাকি করছ কেন।
ডাকছি কি আর সাধে, দেখো না এ মেয়েটা কার মেয়ে, বড় বিরক্ত করছে।
কোন মেয়ে আবার।
পিছন ফিরে দেখি খুকি হাওয়া। কি আশ্চর্য, গেল কোই।
ও পালিয়েছে ভয়ে। আসলে বাবু তো কত আত্মীয় স্বজন কে আশ্রয় দিয়েছেন।
রামুকাকা চলে গেল।
মেয়েটাকে কোথাও দেখেছি মনে হল। কিন্তু তা কি করে হয় ।
রমাদি কে শেষ দেখেছি তখন তার বয়স বারো।আমার থেকে দু বছরের বড় , তার মানে এখন বয়স আঠের- উনিশ।
,আমি স্বপ্ন ঘরে তো যাই নি এখনো, তাছাড়া সে ঠিকানা তো রমাদি জানেই না।
যখন শহরের বিষাক্ত হাওয়া দম বন্ধকরে দেয় তখন আমি আমার স্বপ্নঘরে চলে যাই।
এ ঘরটা আমাদের ছাতে বানিয়েছি, এখানে নেই কলরব ,নেই রাগ ,নেই কোনও অভাব, এ ঘর শান্তির ঘর, আগল ভাংগা, খোলা নীল আকাশ, আকাশ ভরা তারা।
আমার সেই স্বপ্ন ঘরের ঠিকানা বেশী কেউ জানে না ।আমি ল্যাব থেকে বেরিয়ে সিঁডি বেয়ে ছাতে গেলাম।আমার স্বপ্ন ঘর আমি যে কোনও বাড়ির ছাতে নিয়ে যেতে পারি।
ছাতের দরজা খুলে আমি অবাক, অনেকেই তো অনাহুত চলে এসেছে। ছোটো মেয়েটা, মানে ছোটোবেলাররমাদি, মামার ছেলে সত্যেন, পিসির বাড়ির কাজের ছেলে হরিপদ আর ও কিছু ছায়া ছায়া মানুষ চিনতেপারলাম না।
বললাম একি এখানে তো চাঁদের হাট, হঠাৎ কি ব্যাপার ।
মন্টু (আমার স্কুলের বন্ধু) বলল একটা কান্ড হয়ে গেছে।
কি কান্ড?
পরীক্ষার প্রশ্ন পত্র ফাঁস হয়ে গেছে।
কোন পরীক্ষা!
অঙ্ক !
সে কি, তুই জানলি কি করে?
তোর তো জানার কথা।
কি ?
তোর কাকাবাবু তো এবারের অঙ্ক প্রশ্ন পত্র তৈরী করেছেন।
আমি তো তা ঘুনাক্ষরেও জানতে পারিনি- আমার মুখ টা হাঁ হয়ে ঝুলে পরেছে।
আরে বাবা এখন তো জানলি , এখন আর ক্যাচাল না করে প্রস্নপত্রের অঙ্ক সব কাকাবাবুর কাছে করিয়ে নিস।
কোন প্রশ্ন পত্র ?
আরে বাবা প্রশ্নপত্র তোর কাকাবাবুর ল্যাবে রেখে এসেছে রমাদি, তুই গিয়ে খাতায় তুলে নে। আমরা আবারকাল আসব।
স্বপ্ন ভাঙ্গা মধ্যরাতে আমার কানে যেন মধু বর্ষণ।
হঠাৎ মাথার উপর কি যেন পড়ল ঠান্ডা শিরশিরে কানে এল আওয়াজ টিক টিক টিক টিক।
আমি তো চমকে চোদ্দ।
রাত আড়াইটা বাজে।
আমি কাকাবাবুর ল্যাবেই চেয়ারে বসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। দেখলাম একটা ঘিনঘিনে টিকটিকি মাথার থেকেনেমে টেবিলের তলায় ঢুকল। আমি খোলা অঙ্কের খাতায় দেখলাম কাকাবাবুর দেওয়া একটা অঙ্ক যেটা কিনাআমি কিছুতেই সমাধান করতে পারছিলাম না।
আমি টেনিদার স্টাইলে চেঁচিয়ে উঠলাম ইউরেকা; স্বপ্ন ঘর যুগ যুগ জিও।
No comments:
Post a Comment