রানা জামান
লাশ দাফন করার আগেই শুরু হলো অন্য আলোচনা। শুরুটা কে করেছে তা না খুঁজে পক্ষে বিপক্ষে মতামত চলছে।
কথাটা কানে যেতেই নড়েচড়ে বসলো সিলভিয়া। অশ্রু না মুছে মুখে আঁচলচাপা দিলো। সাথে সাথে নাফিস ও রাইসা ঢুকলো কক্ষে। ওদের মুখমণ্ডলে লেগে আছে অশ্রুর শুকনো দাগ।
সিলভিয়া কান্নার শব্দ বাড়িয়ে ছেলেমেয়ের দিকে দুই হাত বাড়িয়ে দিলো। কক্ষের অন্যান্যা মহিলারা ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। সবার মুখমণ্ডলে বিষন্নতার ছাপ। ছেলে-মেয়ে দুটো মার দিকে না গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকায় সবাই অবাক। সিলভিয়া এগিয়ে গিয়ে ওদের আশ্লেষে নিতে চাইলে দু'জন সরে গেলো পেছনে। এবার সিলভিয়া কান্না ভুলে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ওদের দিকে।
এক ভদ্রমহিলা জিজ্ঞেস করলেন ওদের, তোরা মার সাথে অমন করছিস ক্যান? কী হয়েছে তোদের?
জায়েদ বললো, এতোদিন মনে হয়েছিলো উনিও আমার মা। কিন্তু আব্বু মারা যাবার যাবার সাথে সাথে উনি দেখিয়ে দিলেন যে আসলে উনি আমার মা হতে পারেন নি।
তিতলি ফুপিয়ে উঠে বললো, আমি তো উনার পেটের মেয়ে। আমার কথাও ভাবলে না তুমি একথা ভাবার আগে।
কথা শেষ করেই হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো তিতলি।
আরেক ভদ্রমহিলা বললেন, কী কথা নিয়ে তোরা অমন রিএকশান করছিস? কী ভেবেছে তোদের মা? তোদের বাবার তো এখনো কবরও হয়নি।
সিলভিয়া বিছানায় ফিরে গিয়ে দুই হাতে মুখ ঢেকে বিলাপ করতে লাগলো। জায়েদ নির্বিকার থাকলেও তিতলির কান্না হৃদয়স্পর্শি।
প্রথম ভদ্রমহিলা তিতলিকে জড়িয়ে ধরে বললো, অমন করে কান্না করে না রে মা। সব ঠিক হয়ে যাবে।
তিতলি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললো, কিভাবে ঠিক হবে আন্টি? আম্মু তো বিয়ে করে আরেকজনের ঘরে চলে যাবে।
মেয়ের এ কথায় সিলভিয়ার কান্না গেলো থেমে। অশ্রু মুছে দু'জনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কে বললো তোদের একথা? কার কাছে শুনেছিস?
জায়েদ বললো, বাইরে অনেকেই বলাবলি করছে। আমার আম্মু মারা যাবার পর আব্বু তোমাকে বিয়ে করেছিলো। গেলো রাতে আব্বু হার্ট এটাকে মারা গেলো। লোকজন বলাবলি করছে তোমার জোয়ান বয়স। তুমি আরেকজনকে বিয়ে করে আমাদের রেখে চলে যাবে। সিলভিয়া বিস্মিত কণ্ঠে বললো, কী আশ্চর্য! তোদের বাবার এখনো কবর হয় নি, আর আমি এখনই ওসব ভাববো! কারা ওসব বলাবলি করছে, আমাকে দেখাবি। চল। আমি ওদের আচ্ছামতো বকে দেবো।
দ্বিতীয় ভদ্রমহিলা বললো, লাশ বাইরে রেখে সিনক্রিয়েট করা ঠিক হবে না। যার যা ইচ্ছা বলুক। তুমি রিএ্যাক্ট করলে লোকজন নানান কথা বলবে।
জায়েদ বললো, আমাকে মাফ করে আম্মু। আমি তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম। আমি এখনই বাইরে গিয়ে সবাইকে বললো যে আমার আম্মু কখনোই আবার বিয়ে করবে না।
এবার সিলভিয়া খাট থেকে নেমে ছেলেমেয়ে দুটোর কাছে ফের গেলো। দু'জনকে বুকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলো। জায়েদ ও তিতলিও মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো।
তখন দরজার বাইরে একটা পুরুষ কণ্ঠ বললো, লাশের গোসল হয়েছে। জানাজার পর লাশ নিয়ে যাওয়া হবে গোরস্তানে। কাশেম সাহেবের মুখটা শেষবার দেখতে চাইলে আসেন।
সিলভিয়া মাথায় ঘোমটা টেনে দুই ছেলেমেয়েকে বুকের দুইদিকে জড়িয়ে বাইরে যেতে থাকলো। কক্ষের ভদ্রমহিলাগণ ওদের পিছু নিলো।
এপার্টমেন্টের বেসমেন্টে খাটিয়ায় লাশ রাখা আছে। নতুন শাদা কাপড়ে ঢাকা খাটিয়া। খাটিয়ার চারকোণায় আগরবাতি জ্বলছে। সাথে আতর ও গোলাপজলের সুবাস। আগরবাতি, গোলাপজল ও আতরের সুবাস মনে করিয়ে দেয় মৃত্যুকে। মৃত্যু এক অনাকাঙ্খিত আগন্তুক; কোন জীব-ই মৃত্যু কামনা করে না; অথচ তা আসেই। মৃত্যু হাহাকার ছাড়া কোন গৌরব বয়ে আনে না। মৃত্যু আসে মুখব্যাদান করে, ভয়ঙ্কররূপে।
ওদের বেসমেন্টে ঢুকতে দেখে আজমত উদ্দীন একবার ফুপিয়ে এগিয়ে গেলো ওদের দিকে। সিলভিয়ার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললো, এসব কী শুনছি রে ভাগ্নি?
সিলভিয়া বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলো, কী কথা মামা?
তুই দ্বিতীয় বিয়ের কথা ভাবছিস।
মামা! ওর এখনো জানাজা হয়নি, আর তোমরা আমার দ্বিতীয় বিয়ে দেবার কথা ভাবছো!
একজন মুরুব্বী এগিয়ে এসে বললেন, তোমার বয়স অনেক কম মা। স্বামীর মৃত্যুর পর দ্বিতীয় বিয়ে করা দোষের কিছু না। এতে তোমার অবলম্বন হবে, নিরাপত্তাও হবে। একটা কথা মনে রেখো মা: একজন একা নারীর জন্য সমাজ ব্যবস্থা কখনোই ইতিবাচক না। নানান জন নানান কথা বলবে, শকুন থাবা দিতে চাইবে।
সিলভিয়া বিরক্তি চেপে রেখে বললো, আমি এখন এসব ভাবছি না চাচা। কারা এই কথাগুলো ছড়াচ্ছে?
মুরুব্বী বললেন, তুমি না বললেও পরিস্থিতি একথাগুলো বলছে। তোমার আর কাশেমের বয়সের পার্থক্য ছিলো অনেক। সেকারণেই কাশেমের মৃত্যুর পর তোমার বিয়ের কথা বলাবলি করছে সবাই।
এবার আরেকজন মুরুব্বী বললেন, স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবার দ্বিতীয় বিয়ে করতে কোন তালাকের প্রয়োজন হয় না। হাঁ, কাশেমের আগের বৌ-র ঔরশে এক ছেলে ও এই বিধবার এক মেয়ে আছে। যে পুরুষ এই বিধবাকে বিয়ে করবে, তিনি চাইলে এই দুই সন্তানকে সাথে রাখতে পারেন।
এবার সিলভিয়া রেগে বললো, চুপ করুন আপনারা, চুপ করুন! প্লিজ! দুইটা দুধের বাচ্চাকে রেখে আমি কোন দ্বিতীয় বিয়ে করছি না। আপনারা ছেলেমেয়ে দুটোকে ওদের বাবার মুখটা শেষবারের মতো দেখতে দিন।
সিলভিয়া ছেলেমেয়ে দুটোকে বুকে চেপে ধরে ফের ফুপিয়ে উঠলো।
সিলভিয়ার মামা জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, আমি তখনই বলেছিলাম এতো বয়স্ক লোককে বিয়ে করার দরকার নাই। একটা বাচ্চা নিয়া কি সারা জীবন চলা যাবে?
আরেক জন মুরুব্বী বললেন, অসম বয়সে বিয়ে হলে এই সমস্যা হবেই। এবার বিয়ে দেবার সময় ছেলের বয়সটা দেখে নিয়েন জাহাঙ্গীর ভাই। নইলে দেখা যাবে আপনার ভাগ্নীর মৃত্যুর পর ভাগ্নী জামাই-এর আবার বিয়ে করার প্রয়োজন হবে। এই পরম্পর চলতে থাকলে হিস্ট্রি হয়ে যাবে!
এসব আলোচনা মোটেই ভালো লাগছিলো না সিলভিয়ার। সে জাহাঙ্গীর হোসেনকে উদ্দেশ্য করে বললো, আগেও বলেছি, এখনো বলছি, এসব কথাবার্তা আমার একদম ভালো লাগছে না মামা। ছেলেমেয়ে দুটো কী মনে করবে ভাবো তো একবার মামা!
জাহাঙ্গীর হোসেন ছেলেমেয়ে দুটোর দিকে তাকিয়ে বললো, তাও ঠিক।
জায়েদ জাহাঙ্গীর হোসেনের দিকে তাকিয়ে বললো, তুমি খুব পঁচা হয়ে গেছো নানা।
সাথে সাথে তিতলিও বললো, মেঝো নানা পঁচা।
No comments:
Post a Comment