Monday, 8 August 2022

শাওন দিনে--তমালিকা ঘোষাল ব্যানার্জী

শাওন দিনে--
তমালিকা ঘোষাল ব্যানার্জী

"ও বিন্তিদিদি, বাড়ি ফিরছো? এদিক দিয়ে এসো, তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাবে.."

বলেই পাশের গলির ভিতরে ছুট লাগায় বিট্টু। বিন্তিও তার পেছন পেছন ছোটে। ক'দিন হলো এসেছে, সব রাস্তাঘাট তেমন চেনাও নয়। তবে বিট্টুর উপর ভরসা আছে।

বিন্তির মামারবাড়ি খোয়াইপুর গ্রামে, মেধাবী মেয়ে সে। নিজেদের গ্রামের কাছাকাছি কোনো কলেজ না থাকায় মামারবাড়ি থেকেই পড়াশোনা করছে। সদরে কলেজ, তেমন দূর নয় মামারবাড়ি থেকে। সমস্যার কথা জানতে পেরে প্রস্তাবটা মামা নিজেই দিয়েছিলেন বিন্তিদের বাড়িতে। সেই শুনে সকলে রাজি হয়ে যায়। বিন্তির ইচ্ছা ছিল না বাবা মা ভাইকে ছেড়ে আসতে, কিন্তু উপায় কী! শুধু কলেজই নয়, মামারবাড়ির কাছে টিউশন কোচিংয়ের খোঁজও পেয়ে গেলো। যাতায়াতের পথে বিন্তির বন্ধুত্ব হয়ে যায় বিট্টুর সঙ্গে। বিট্টু তার ভাইয়ের বয়সী হবে। ওকে দেখলেই ভাইটার কথা মনে পড়ে যায়।

আজ পড়ে ফেরার পথে আকাশ কালো করে মেঘ ডাকতে আরম্ভ করলো। বর্ষার আকাশ। বইখাতার ব্যাগটা জাপটে ধরে বিন্তি ছুটতে শুরু করে। তখনই দেখে বিট্টুকে, তাকে আসতে বলে একটা গলির মধ্যে ঢুকে গেল। বিট্টুর পিছু নিল বিন্তি। এতে তার সুবিধাই হলো বেশ, তাড়াতাড়ি পৌঁছে গেলো। এইতো এই রাস্তাটাই ভালো, এবার থেকে এখান দিয়েই যাবে আসবে। কিন্তু কলেজ আর টিউশন পড়তে যাওয়ার পথে বিন্তি লক্ষ্য করে ওই রাস্তায় আর কেউ যায় না। রাস্তাটা ভালোই বেশ। একপাশে মাঠ, গাছপালা। অন্যপাশে একটা বড়ো পুকুর, পরিষ্কার টলটলে জল তাতে।

সেদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে, ছাতাতেও বাঁধ মানে না। অগত্যা ওই মাঠের পাশে একটা গাছের তলায় দাঁড়াতে হয় বিন্তিকে। চোখ চলে যায় উল্টোদিকের পুকুরটায়। কেউ আছে বলে মনে হচ্ছে! বৃষ্টিটা একটু কমলে হাঁটা ধরে সে। যাওয়ার পথে দেখে একজন মহিলা পুকুরঘাটে বসে নীচু হয়ে কোনো কাজ করছে, বাসনকোসন ধুচ্ছে মনে হয়। আর একটা লোক ছাতা ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তারপর থেকে যাতায়াতের পথে বিন্তি লক্ষ্য করে, শুধুমাত্র বৃষ্টির দিনেই পুকুরঘাটে ওই মহিলা আর লোকটা আসে। অদ্ভুত! বৃষ্টিতেই এদের পুকুরঘাটে বাসন ধুতে আসতে হয়!

ক'দিন যাবৎ কলেজের সামনে কয়েকটা ছোকরাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে। বিন্তির দিকে কেমনভাবে তাকিয়ে মিচকে হাসে, নিজেদের মধ্যে গুজগুজ করে কীসব কথাও বলে। মামাকে কী বলবে! তারপর ভাবে নাহ্ থাক, এমনিতেই মামারবাড়িতে থেকে পড়াশোনা করছে বলে তার মধ্যে একটা সঙ্কোচ কাজ করে। তার উপর এসব জানিয়ে মামাকে আর ব্যতিব্যস্ত না করাই ভালো। তবে বিন্তির মনটা আজ বেশ খুশি হয়ে আছে, তার কলেজের টেস্ট পরীক্ষা শেষ। ক'দিন রাতে ভালো করে ঘুমোতে পারেনি পড়ার চাপে, আজ জমিয়ে ঘুমোবে। ভাবতে ভাবতে হাঁটতে থাকে।

"কী মামণি, একা একা ফিরছো?"

চমকে ওঠে বিন্তি। পেছন ফিরে দেখে সেই ছেলেগুলো, বিশ্রীভাবে হাসতে হাসতে আসছে। ভয়ে গলাটা শুকিয়ে যায়। এ রাস্তায় এমনিতেই কেউ আসে না, প্রয়োজনে ডাকার মতো একটা লোক পাবে না সে। হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়। আজ আবার আকাশের অবস্থাটাও ভালো ঠেকছে না, বৃষ্টি এই নামলো বলে।

"আরে, জোরে হাঁটতে শুরু করলে যে! পছন্দ নয় নাকি আমাদের! দাঁড়াও না একটু.." ছেলেগুলোও জোরে হাঁটতে থাকে।

এমনসময় ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে। ছাতা খোলার কথা বিন্তির আর মনে থাকে না। দৌড়তে শুরু করে। কিন্তু এমনই কপাল, বেকায়দায় পা মচকে পড়ে যায়। ছেলেগুলোও সেই সুযোগে কাছে চলে এসে দাঁত বের করে হাসতে থাকে।

অসহায়ভাবে বিন্তি চেঁচিয়ে ওঠে, "কেউ আছ? বাঁচাও!!" তারপর ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে মিনতি করে, "প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন, আমি আপনাদের বোনের মতো!"

"কীযে বলো! দুনিয়াশুদ্ধু মেয়েদেরকে কি আমরা বোন বানাবো!" বলে ওঠে একটা ছেলে।

বিন্তি উঠে আবার দৌড়তে গিয়ে চোখ পড়ে পুকুরঘাটের দিকে। ওইতো বউটা আর লোকটা! তাদের দিকে ছুটে যায়।

"প্লিজ আমাকে বাঁচান.."

লোকটা ছাতা মাথায় ঘুরে দাঁড়ায়, ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। ততক্ষণে ছেলেগুলোও এগিয়ে এসেছে।

"এ বাঁচাবে! একে তো একটা থাবড়া দিলেই উল্টে পড়ে যাবে রে!" হাসতে থাকে ছেলেগুলো। "ও বৌদি, তোমার বরকে আঁচলে বেঁধে মানে মানে কেটে পড়ো। নয়তো.."

এবার বউটা পুকুরঘাট থেকে উঠে সামনে এসে দাঁড়ায়। ভয়ে বিস্ময়ে শিহরণ খেলে যায় বিন্তির গোটা শরীরে। বউটার চোখদু'টো সম্পূর্ণ সাদা, চোখের মণি নেই। গলার কাছে আড়াআড়ি চেরা, রক্ত জমাট বাঁধার মতো কালো হয়ে আছে।

লোকটা এবার ছাতাটা তুলে ধরে, এতক্ষণ ছাতার জন্য মুখখানা দেখা যাচ্ছিল না। লোকটার গলার উপর থেকে মাথাটাই নেই। ওই দেখে ছেলেগুলো ভয়ে আর্তনাদ করে ছুট লাগায়। বিন্তি আর স্থির থাকতে পারে না, জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে।

................................................................................

বিন্তির জ্ঞান ফিরলে দেখে সে মামারবাড়িতে বিছানায় শুয়ে আছে। মামা মামীমা ভাইবোনেরা উদ্বিগ্ন মুখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ঘরের একপাশে কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে আছে বিট্টু।

"এইতো, যাক বাবা, কী ভয়টাই না পেয়ে গেছিলাম! দাঁড়া তোর জন্য খাবার নিয়ে আসি।" মামীমা বলেন।

"বিট্টুর মুখে সব শুনেছি। তুমি পুকুরঘাটের রাস্তায় গিয়ে মোটেও ঠিক কাজ করোনি। একবার অন্তত আমাদের জানাতে পারতে।" গম্ভীর মুখে বলেন মামা।

বিন্তি বুঝতে পারে মামা যারপরনাই রেগে গেছেন। রেগে গেলে মামা "তুই" থেকে "তুমি" করে কথা বলেন।

"অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও তোমাকে না পেয়ে যখন আমরা পুলিশের কাছে যাবো বলে মনস্থির করি তখন বিট্টু আমাদের পুকুরঘাটের রাস্তায় নিয়ে যায়। ওখানেই পাই তোমায়। এবার থেকে ওই রাস্তা দিয়ে যেন না যেতে দেখি। বিট্টুকেও আমি বুঝিয়ে দিয়েছি।" হুঁশিয়ারি দেন মামা। বিন্তি চুপচাপ শুনে যায়।

রাতে খাওয়ার পর মামীমা বিন্তির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন যাতে সে ঘুমিয়ে পড়ে। মামাকে জিজ্ঞাসা করতে তো সাহসে কুলোয়নি, মামীর কাছে জানতে চায়।

"আচ্ছা মামীমা, পুকুরঘাটের ওই লোকটা আর বউটা কে?"

"কে বলতো?"

"একটা লোক, তার মাথা নেই। আর বউটার চোখদু'টো সাদা, গলায় কাটা দাগ।"

মামীমা চমকে ওঠেন, "সর্বনাশ! তুই দেখেছিস নাকি?"

বিন্তি ঘাড় নাড়ে।

"কী কাণ্ড!" মামীমা বলে যান, "বিয়ের পর এবাড়িতে এসে লোকমুখে শুনেছি, পুকুরঘাটের উল্টোদিকের মাঠের পাশে একটা বাড়ি ছিল। এখনও আছে, ভাঙাচোরা হয়ে জঙ্গলে ঢেকে পড়ে আছে, রাস্তা থেকে দেখা যায় না। ওই বাড়িতে নীলমণি বলে একটা লোক আর তার বউ থাকতো। কী একটা নিয়ে কতগুলো লোকের সঙ্গে বচসা বাঁধে নীলমণির। এরকমই এক বৃষ্টির দিনে নীলমণির বউ বাসন ধুতে পুকুরঘাটে যায়, নীলমণিও তার সঙ্গে ছিল। ওইদিন ওই লোকগুলো এসে নীলমণির বউয়ের গলা কেটে খুন করে তাকে আর নীলমণির মাথাটা ধড় থেকে আলাদা করে দেহটা পুকুরে ফেলে দিয়ে যায়।

তার ক'দিন পরে সেই লোকগুলোর প্রত্যেকে কোনো না কোনোভাবে মারা যায়। সবাই বলে নীলমণি আর তার বউ প্রতিশোধ নিয়েছিল। তারপর থেকে বৃষ্টির দিনে ওই রাস্তা ধরে যারাই গেছে, বলেছে নীলমণি আর ওর বউকে পুকুরঘাটে দেখেছে। এখন ওই পথে কেউ আর যায় না। আমি এতোদিন ভাবতাম লোকের মুখে মুখে ঘোরা এমনি গল্প। তবে তুই যখন চাক্ষুষ দেখেছিস, আর কোনো সন্দেহ নেই। বাবা রে, ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে! এতো কাছে ভূতের বাস!"

বিন্তি চুপচাপ শুনে যায়, ছেলেগুলোর ব্যাপারে কিছু আর জানায় না। কলেজ আবার শুরু হতে বিন্তি ভয়ে ভয়ে গিয়েছিল, তবে অন্য রাস্তা ধরে। তারপর থেকে ছেলেগুলোকে আর ওই এলাকার ত্রিসীমানায় দেখেনি সে।

(সমাপ্ত)

No comments:

Post a Comment

অসিত কুমার পাল--নারী জীবনের সার্থকতা

অসিত কুমার পাল-- নারী জীবনের সার্থকতা ____________________ সমীরণ একটা বখে যাওয়া ছেলে, বয়স চব্বিশ পঁচিশ । তার বাবা ফুটপাতের খুচ...