রবীন বসু
আমাদের গল্পের হরিদাস অত্যন্ত সরল সাদামাটা একটা ছেলে। তার মধ্যে কোন ঘোরপ্যাঁচ নেই। সে সবাইকে বিশ্বাস করে। আর এই বিশ্বাস করতে গিয়ে বার বার ঠকেছে। এমনকি এখনও ঠকছে।
ব্যাপারটা খোলসা করেই বলি। বুড়ো মা যতদিন বেঁচে ছিল, তাকে আগলে রেখেছিল। বাবা সেই কোন ছোটবেলায় মারা গেছে। মুখটা ঠিক মত মনেও পড়ে না। বাড়ির দেয়ালে বাবার কোন ছবিও নেই। বাস্তু ছাড়া এক টুকরো ক্ষেতি ছিল। সেখানে সব্জি চাষ করে মা-ছেলের সংসার চলত। দু'জন মিলে কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়ে, জল ঢেলে বিভিন্ন মরশুমে বিভিন্ন সব্জি চাষ করত। বাগান থেকে ফসল তুলে ঝাঁকা ভর্তি করে ভ্যানরিক্সায় চাপিয়ে হাটে নিয়ে পাইকারি দিয়ে আসত। ভালই চলছিল। কিন্তু সমস্যা হল তিন দিনের এক অজানা জ্বরে মা হঠাৎ মারা যেতে। ডাক্তারও বুঝতে পারল না কী জ্বর। সেই থেকে হরিদাস কেমন একা হয়ে গেল। উনুন জ্বেলে হাত পুড়িয়ে রান্না করে খেতেও ভালো লাগতো না। তাই অনেক সময় আধপেটা খেয়ে, মুড়ি পান্তা দিয়ে পেট ভরাত। রাতে শুতে গেলে খুব একা লাগতো। শরীর যেন কিছু চাইতো। মনটা সব সময় উদাস উদাস। একদিন হাটে পুবপাড়ার সদাশিব কাকা তাকে হাত ধরে বসাল।
"হরি, বোস। মিষ্টি খা। তোর সাতে কতা আচে।"
"কী বোলবে শিবকাকা? হরিদাস জানতে চায়। "বাড়ি ফিরতি হবে। গাচে জল দোব।"
"সে তো দিবি। কিন্তু নিজের শরীলে কবে জল দিবি বাপ্!"
"মানে!" কী বলচ তুমি?"
"বলচিলুম, জোয়ান ছেলে, শরীলটা দেকেচিস! কেমন পাকাটি হয়ে যাচ্চিস দিন দিন। কতদিন হাত পুড়িয়ে খাবি? তাছাড়া যৈবনের তো একটা খিদে আছে। আমি বলি কি এট্টা বে' কর, বাপ্।'
বে'র কথা হরিদাসের যে মনে হয়নি তা নয়। যুবতী মেয়ে দেখলে শরীর কেমন জানান দেয়। রাতে স্বপ্ন আসে। কিন্তু সাহসে কুলোয়নি বে' করতে। মা থাকলে তবু হত।
"আচ্চা, ভেবে দেখি কাকা, কটা দিন আমাকে সোময় দাও।''
এর ঠিক চারমাস বাদে বোশেখের শেষ দিকে হরিদাসের বিয়ে হয়ে গেল। তিন গাঁয়ের পরের গাঁ পলাশপুরের ঈশ্বর চিন্তামনি মণ্ডলের একমাত্র মেয়ে সরমার সঙ্গে। শিবকাকাই সব ব্যবস্থা করল।
কিন্তু অষ্টমঙ্গলায় গিয়েই হরিদাসের চটক ভাঙে। চিন্তামনি মণ্ডলের বিধবা বউ মানে হরিদাসের শাশুড়ি খাওয়াদাওয়ার পর একটা হাতপাখা নিয়ে বিছানা দখল নিল। তারপর মাঝরাত পর্যন্ত উপদেশ পরামর্শ। তার মোদ্দা কথা হল, ওবাড়ির পাট চুকিয়ে এখানে এসে থাকতে হবে। বাস্তু বাগান সব সরমার নামে লিখে দিতে হবে ।
হরিদাস চেঁচিয়ে উঠেছিল। "আমার বাপ-মার ভিটে থাকতে আমি এখানে ঘরজামাই থাকতি পারবুনি। আর সম্পত্তি আমি কাউকে নিকে দেবনি।"
শাশুড়ি ছুটে এসে হরিদাসের গলা চেপে ধরে। সঙ্গে সরমা। "দিবি না মানে। তোর মরা বাপ দেবে। শিবেকে বলে তোর মত একটা ক্যাবলাকে জামাই করিচি সে কি শুদু শুদু দুধু খাওয়াব বলে।"
হরিদাস এবার বুঝতে পারে ষড়যন্ত্রের মূল শিবকাকা। ওকে বিশ্বাস করাই তার ভুল হয়েছে। মরা মার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। জলে ভরে গেল চোখ। এখন সে কী করবে! মাথা ঠাণ্ডা রেখে একটা উপায় বের করতে হবে।
অষ্টমঙ্গলার পর ফিরে এসে সে শিবকাকার মুখোমুখি হয়। "তোমাকে বিশ্বেস করলুম আর তুমিই পিঠে ছুরি মারলে।"
"ছুরি মারব কেন রে। ব্যাপারটা মেনে নে। সরমা তোর বউ। তার তো একটা ভবিষ্যৎ আছে। সম্পত্তি নিকে দে।"
"আমি মরলে তো ওই সব পাবে। আগে নিকে দুবুনি।" হরিদাসের গলায় দৃঢ়তা।
সদাশিবের আসল দাঁত নখ বেরিয়ে পড়ল। রক্তচক্ষু নিয়ে সে বলল, " দিবিনি তো! তা'লে কিন্তু তোর কপালে ভোগান্তি আছে। সরমাকে দিয়ে থানায় তোর নামে বধূনির্যাতনের কেস করাব। পুলিশ তোকে অ্যারেস্ট করবে। জেল হবে। কে তোর জামিন করাবে হরি! জেলে পচতি হবে।"
হরিদাস এবার ভয় পায়। সত্যি তো। কেস হলে সে কী করবে? কে তাকে সাহায্য করবে? কাকে সে বিশ্বাস করবে? তার টাকার জোর নেই। আতান্তরে পড়ে হরিদাস হতাশার গভীর গর্তে সেঁধিয়ে গিয়ে মরিয়া চেষ্টায় উঠে দাঁড়াল। তারপর একরকম টলতে টলতে গাঁয়ের প্রধান ভবতোষ গায়েনের কাছে গেল। সব খুলে বলে। ওখানেই জানতে পারে চিন্তামনির বিধবা বউ আসলে সদাশিবের রক্ষিতা। ওকে বিয়ে দিয়ে সে হরিদাসের বাস্তু বাগান করায়ত্ত করতে চায়। এখন উপায়?
"উপায় তেমন কিছু নেই হরিদাস। বিয়ের আগে একবার আমার কাছে আসতে পারতে। ওরা যে কোন সময় থানাকে টাকা খাইয়ে তোমাকে ৪৯৮এ কেসে ফাঁসিয়ে দিতে পারে।"
"তাহলে আমি কী করব এখন?" হরিদাস ভেঙে পড়ে।
"বসো। জল খাও। আমাকে একটু ভাবতে দাও।"
ভবতোষ মওকা বুঝে জাল বোনে। ছোট ছেলেটার সঙ্গে ঠিক বনিবনা হচ্ছে না। হরিদাসের বাস্তুটা পেলে তাকে ভেন্ন করে আলাদা করে দেয়। সুযোগ যখন এসেছে একবার চেষ্টা করা যাক।
"একটা উপায় আছে হরি। ভেবে দেখ, ওরা কিন্তু কিচুতেই তোমাকে ছাড়বে না। জোর করে ভয় দেখিয়ে, মারধর করে সম্পত্তি ঠিক নিকিয়ে নেবে। আর তারপর তোমাকে নাতি মেরে বের করে দেবে। আমি বলি কী, তার আগে তুমি বাস্তু বাগান বিক্রি করে দাও। আমি তোমাকে ইস্টিশনের কাচে সরকারি ভেস্টেড ল্যান্ড থেকে কিছুটা জমি পাট্টা দেবার ব্যবস্থা করে দেব। তুমি দোকান করে দিব্যি থাকবে।"
হরিদাস অসহায় ভাবে বলে, "কে কিনবে, কাকা?"
"কেন, আমি কিনব। তবে বাপু পুরো দাম পাবে না। তোমাকে যে জায়গা পাট্টা দেব তার জন্য তো একটা খরচ আছে।"
হরিদাস আরও ধাঁধায় পড়ে গেল। তার মাথা ঝিমঝিম করছে। মানুষ সবাই কেমন লোভ নিয়ে, উদ্দেশ্য নিয়ে বসে আছে। অসহায় বিপদগ্রস্তকে আরও বিপদে ফেলে। একসময় নিজেকে শেষ করে দেবার যে প্রবণতা তার মধ্যে ছিল, আবার তা চাগাড় দিচ্ছে। এবার উঠে দাঁড়াল সে। পিছনে প্রধানের গলা ভেসে আসে, "হরিদাস আমি ছাড়া তোমাকে কেউ বাঁচাতি পারবে না…"
এ কোন নাগপাশে জড়াল জীবন। অবলম্বনহীন শূন্যতায় দুলতে দুলতে হরিদাস অন্ধকারে বাড়ির পথ ধরল…
••
No comments:
Post a Comment