Sunday, 7 August 2022

ব্রুনো---বীরেন্দ্র কুমার মন্ডল


ব্রুনো---
বীরেন্দ্র কুমার মন্ডল

ব্রুনো গতকাল সন্ধ্যা বেলা ঘর ছেড়ে চলে গেছে। একটা গাড়ির আওয়াজ শুনে দরজা খুলে রমাকান্ত দেখলো তার শালা রবি ।একগাল হেসে বলল কি জামাইবাবু ভালো আছেন ? সেই সময় ব্রুনো  দৌড়ে  বাড়ির সামনে রাস্তায় চলে যায় সঙ্গে সঙ্গে রমাকান্তর  ছেলে রমেশ পিছন পিছন দৌড়ে যায়।ব্রুনো  দৌড়ে একটা পরিত্যক্ত গ্যারেজের 
 ভিতরে ঢুকে নিমেষে অদৃশ্য হয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও ব্রুনোকে  পাওয়া গেল না। প্রায় রাত দশটা এগারোটা পর্যন্ত খোঁজাখুঁজির পরও। 
পরদিন সকালে ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছিল ।আমাদের দশজনের মর্নিংওয়াক গ্রুপের আমি আর চন্দ্রভানু আগে এসে পৌঁছলাম ।তখন দেখি গ্যারেজের  কাছে রমাকান্ত হাতে একটা চেইন ছাতি মাথায় ।আমি বলে উঠলাম সার্ভেন্ট ইজ  হিয়ার হোয়ার  ইজ দা মাস্টার। রমাকান্ত তখন বলল ব্রুনোকে কাল রাত থেকে পাওয়া যাচ্ছে না ।
এখানে বলে রাখি ব্রুনো হচ্ছে ল্যাব্রাডর প্রজাতির এক সাড়ে চার বছরের পোষা কুকুর। রমাকান্ত ওকে প্রতিদিন চেন  বেঁধে  হাতে একটা লাঠি নিয়ে  আমাদের সঙ্গে মর্নিং ওয়াক করত। আমাদের দশজনকেই ব্রুনো চিনত ।এবং ওর ভাষায় প্রায় সবার সাথে মাঝে মাঝে কথা বলতো। মানে ঘেউ ঘেউ করে  ওর মনের ভাব প্রকাশ করত। এর ভিতর চিফ ইঞ্জিনিয়ার ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ফেরত মদন মোহনের সাথে ওর একটা সখ্যতা ছিল। রমাকান্ত সঙ্গে ঘুরে এসে আমাদের একটা কমন স্থান ছিল ওখানে আমরা সবাই এসে দাঁড়াতাম । রমাকান্ত ঘুরে এলে ব্রুনো  মাঝে মাঝে মদনমোহনের কাছে গিয়ে ওর ভাষায় ঘেউ ঘেউ করে চিত্কার করে কি যেন  বলতো। এক দুই  মিনিট ডাকার  পরে চুপ করে যেত। তখন মদনমোহন ওর মাথায়  গায়ে হাত বুলিয়ে বলতো ঠিক আছে ঠিক আছে আমি রমাকান্ত কে বুঝিয়ে বলব। কি বলবো মদনমোহন জানে আর ব্রুনো  জানে? আমি মদনমোহন কে জিজ্ঞাসা করতাম আপনি বোঝেন ওর কথা ? উনি বলতেন হ্যাঁ বুঝি। মদনমোহন বলতো ওর প্রাকৃতিক কাজ সারার সময়ে  রমাকান্ত ব্রুনোকে  বিরক্ত করেছে।  এইরকম কিংবা ব্রুনোকে অনেক হাটিয়েছে। 
একদিন দেখি রমাকান্ত সাইকেলে আর ব্রুনো 
 চেন  দিয়ে বাঁধা সাইকেলের পিছন পিছন অল্প অল্প দৌড়ে চলছে। ফেরার পথে রমাকান্ত সাইকেল থেকে নেমে আমাদের সঙ্গে সাইকেল ঠেলে ঠেলে চলতে থাকে। হঠাৎ ব্রুনো  সাইকেলের সামনে এসে বাধা দেয় যাতে রমাকান্ত আর না এগোতে পারে ।অনেক চেষ্টা করেও ওকে সাইকেলের সামনে থেকে সরানো গেল না। ব্রুনো  ভেবেছে রমাকান্ত সাইকেল যাচ্ছে আর আমাকে হাঁটাচ্ছ ।তখন আমাদের সাইক্লিষ্ট  প্রফেসর শংকর দাস চৌধুরী রমাকান্ত ওর হাত থেকে সাইকেলটা নিয়ে চালাতে শুরু করে। আর রমাকান্তর সাথে ব্রুনো অল্প অল্প দৌড়ে চলতে থাকে।
সেই ব্রুনো  হারিয়ে গেছে। সব জায়গায় খোঁজা হলো কোথাও পাওয়া গেল না। সোশ্যাল মিডিয়া হোয়াটসঅ্যাপ ফেসবুক এবং সবাইকে টেলিফোন সবরকম খোজা হল। চার পাঁচ দিন কেটে গেল। কোনরকম খবর নেই। রমাকান্ত মুখ শুকিয়ে আমাদের সঙ্গে মর্নিং ওয়াক করে। সাত দিনের মাথায় রমাকান্ত হঠাৎ  ব্রুনোকে  নিয়ে মর্নিংওয়াকে এল। আমরা সবাই আশ্চর্য হয়ে রমাকান্ত কে ঘিরে ধরলাম। ও বলল ব্রুনো  ঘর থেকে পালিয়ে গ্যারেজ হয়ে বড় রাস্তার মোড়ে চলে যায় ।সেখানে একটা  কার দাঁড়ান  ছিল। কারের দরজা খোলা রেখে একটা লোক কি জন্য অপেক্ষা করছিল।ব্রুনো  সোজা লোকটার কাছে চলে যায়। লোকটা ব্রুনোকে ডাকতেই মানুষের মত কারে উঠে লোকটার পাশে গিয়ে বসে। লোকটা  কার চালিয়ে তার বাড়ি প্রায় 30 কিলোমিটার দূর  পাত্রপাড়া নামে জায়গায় তার ঘরে নিয়ে যায় ।রমাকান্তর ছেলে বিভিন্ন সূত্রে খবর সংগ্রহ করে তার বাড়ি চলে যায়। ব্রুনো  সঙ্গে সঙ্গে রমেশের সঙ্গে চলে আসে ।আমরা সবাই খুশি। আগের মত ব্রুনো  আমাদের সঙ্গে মর্নিং ওয়াক করে। আমরা চা বিস্কুট খাই।ব্রুনো   বিস্কুট খায়। 

ব্রুনো  কিন্তু একটা পুরুষ কুকুর ছিল। ওর কোন সাথী স্ত্রী ল্যাব্রাডর কুকুর কোথাও পাওয়া যায়নি। এরজন্য ও কঠোর একাকীত্বের দিন কাটাচ্ছিল। আমরা মাঝে মাঝে ওর বিষয়ে বলাবলি করি। কি করে ওর একটা সাথী জোগাড় করা যায়? ওই ভাবে চলছিল ।আমি মাঝে মাঝে ভুবনেশ্বর থেকে আমার গ্রামের বাড়ি যাই। আবার ভুবনেশ্বর আমার বাড়িতে ফিরে আসি। বন্ধুদের সঙ্গে সকালে মর্নিং ওয়াক করি। 
এর ভিতর প্রকাশ আমাদের পুরনো বন্ধু রিটায়ার  করে আসে। কথায় কথায় জানা গেল ওর একটা ফিমেল ল্যাব্রাডর আছে। শুনে আমরা সবাই খুশি হলাম। একদিন আমরা বন্ধুরা মিলে ব্রুনোকে নিয়ে প্রকাশের বাড়ি গেলাম। ব্রুনো  প্রকাশের ল্যাব্রাডর জুলিকে দেখে খুব খুশি হলো। দুইজন মিলে খুব লাফালাফি ঝাপাঝাপি ও পরে দুইজনে একে অপরকে মুখ দিয়ে খুব আদর করলো। 
প্রকাশ অন্য পাড়া থেকে মর্নিং ওয়াকে  এসে আমাদের সঙ্গে মিশত। প্রকাশকে দেখলে ব্রুনো  বিনা দ্বিধায় ওর সঙ্গে চলে যায় ওর নতুন সাথীর সাথে সময় কাটাতে। রমাকান্ত নিশ্চিন্তে ব্রুনোকে ছেড়ে দেয়। মুখে এক চিলতে পরিতৃপ্তির হাসি হাসে। আমরাও  দেখলে খুশি হই। যাক এতদিন পরে ওর ভালবাসার একজন বন্ধু পেয়েছে। এই খুশিতে রমাকান্ত একদিন আমাদের বন্ধু প্রফেসার দাস চৌধুরীর বাড়িতে একটা ভোজের বন্দোবস্ত করে। রিটায়ার এস পি আই বি মৃত্যুঞ্জয়  বাবু বললেন যাক রমাকান্ত তোমার সমস্যার সমাধান এতদিন পরে হলো। আমরা সবাই খুব হাসলাম। 

সমাপ্ত


No comments:

Post a Comment

অসিত কুমার পাল--নারী জীবনের সার্থকতা

অসিত কুমার পাল-- নারী জীবনের সার্থকতা ____________________ সমীরণ একটা বখে যাওয়া ছেলে, বয়স চব্বিশ পঁচিশ । তার বাবা ফুটপাতের খুচ...