রাত প্রায় পৌনে দেড়টা। নিপুদের বাড়ির সামনের বাড়িতে তখনও লাগাতার ঢাক বাজছে, সঙ্গে কাসর ঘন্টা। মাইকে পুরোহিতের জোরালো কণ্ঠে ভুল-ভাল যত উচ্চারণ - "সর্বমঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থ সাধিকে স্মরন্যে ত্রম্বকে গৌরী নারায়ণী নমঃস্তুতে.." ওম স্বাহা:! এই একটা মন্ত্র যে কতবার কানে এল নিপুর, তা সে ঠিকমতো গুনতেও পারে নি। কাল যে তার উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষা। সাবজেক্ট ফিজিক্স। এত রাত। অথচ নিপুর চোখে ঘুম নেই। পড়তেও পারছে না ঠিকমতো। পূজোর শব্দে, উলুধ্বনিতে ভীষণ বিব্রত হয়ে পড়ছে সে ও তার পরিবার। সামনের বাড়িতে পূজো। তাই, কাউকে কিছু বলারও নেই। শুধু দুঃখ একটাই। এত কিছু হচ্ছে, জানছে, বুঝছে সে। কিন্তু পূজোয় তাদের বাড়ির লোকের কারোর নিমন্ত্রণ নেই। কেননা, ওদের বাড়ির লোককে ওদের বাড়ির লোকেরা পছন্দ করে না, দেখতে পারে না। নিপুর মনে তখন প্রশ্ন জাগে। তাহলে কিসের পূজো, এত আয়োজন। সর্ব মঙ্গল... ! তারা যদি আমন্ত্রিতই না হয়, তাহলে এত মন্ত্র, শব্দ উচ্চারণ তাদের শুনতেই বা হবে কেন ? এরকম পূজোরই বা কি মানে? ঢাক বাজানো মানে তো লোককে জানানো, যে - কিছু একটা হচ্ছে এখানে, তোমরা সবাই এসো। তাহলে তাদের বলা হয়নি কেন? আর, মন্ত্র কি মাইকে বলতেই হবে? তাহলে কি দেবী আরো ভালো শোনেন? বেশি খুশি হন? আশীর্বাদ করেন? নিপু এসব প্রশ্ন করে ওর বাবাকে। নিপুর বাবা ঘুমের ঘোরে নিপুকে বলে ওঠে, "ঘুমানোর চেষ্টা কর। এছাড়া কিছুই করার নেই। এটাই সমাজ। ধর্ম। সামাজিক রীতিনীতি, নিয়ম।" নিপু বিছানায় শুয়ে শুয়েই শুনতে পায় - সামনের বাড়িতে তখনও চলছে পূজোর ঘনঘটা, মন্ত্রোচ্চারণ, প্রসাদ ভক্ষণ...। রাত আড়াইটার পরও কারা যেন কথা বলে চলেছে - যারা সে বাড়ির আপনজন।
.
No comments:
Post a Comment