Sunday, 7 August 2022

মনুষ্যত্ব--প্রেরণা বড়াল

মনুষ্যত্ব-- 
প্রেরণা বড়াল 

জ্ঞাননাথ বাবু এবং তার স্ত্রীর জীবনে শত সুখের মধ্যেও একটু আক্ষেপ ছিল।তা হল তাদের একমাত্র কন্যা সন্তান কোকিলা যে কি না তোৎলা। জ্ঞাননাথ বাবুর বিরাট অবস্থা। তিনি মন স্থির করেন ঘর জামাই রাখবেন। ওদের জীবনের শেষ বেলা আর মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এমন একটা ছেলে খুঁজছিলেন,যে সারা জীবন ওদের ছেড়ে কোথাও যাবে না।পেয়ে ও গেলেন বনোজ বলেএকটি অনাথ ছেলেকে।যার বড় বিধবা দিদি বিমলা ছাড়া আর কেহ ছিল না। বিমলা গতরে খেটে কোন রকম দিন চালাতো।।জ্ঞাননাথ বাবু ওদের বাড়ীতে নিয়ে আসেন এবং ছেলে মেয়ের মতই রাখেন। জ্ঞাননাথ বাবু ও তার স্ত্রীকে দেখে বিমলার মনে হত যেন সে আবার তার  মা,বাবাকে এই রুপে ফিরে পেয়েছে। জ্ঞাননাথ বাবু বনোজকে পড়িয়ে লিখিয়ে বড় করে  মেয়ের সাথে বিয়ে দিলেন। কোকিলার এক ছেলে হল। বনোজ ওঁদের সমস্ত বিষয় সম্পত্তি দেখা শোনা করতো। জ্ঞাননাথ বাবু নিশ্চিন্ত হয়ে নাতির সাথে খেলা করে বেশ দিন কাটাচ্ছিলেন। 
         কিন্ত কালের ফেরে-ধর্মীয় উন্মাদনায় বিধ্বস্ত হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয় জ্ঞাননাথ বাবু। গোয়াল ভরা গরু, গোলা ভরা ধান,  পুকুর ভরা মাছ, জমি-বাড়ী সব ফেলে আসার শোক সামলাতে না পেরে বছর খানেকের মধ্যেই মারা যান জ্ঞাননাথ বাবু এবং তার ছমাস পরে কোকিলার মা ও ইহলোক ত্যাগ করেন। এখন স্বামী, ননদ আর ছেলে নিয়েই কোকিলার সংসার।কিন্ত সংসারের কথা তো কোকিলা কোনোদিন বোঝে নাই।দেশে সংসার দেখে নিত ওর মা আর বিদেশে বিমলা।কোকিলার স্বামী বিদেশে আসার পর একটা চাকরি জোগাড় করতে পেরেছিল। তাই মোটামুটি দিন চলে যাচ্ছিল। 
কিন্ত বেশিদিন এই সুখ টুকুও ওদের কপালে সইল না।বনোজ তার সহকর্মী মেয়ের সাথে বিয়ে করে কোকিলাকে ছেড়ে চলে গেল।বনোজের দিদি বিমলা কিন্ত ভাইয়ের এই ব্যাপারে পুরোপুরিই বিরোধ করেছে।"আরে মনুষ্যত্ব বলে কিছু আছে।যারা আশ্রয় দিয়েছে, যাদের অন্ন খেয়ে মানুষ হয়েছে তাদের উপর অমানবিকতা কি করে করতে পারে।কোকিলাদের ঘরে কোকিলার বড় দিদির মতই আদর যত্ন পেয়েছে সে।এতটুকু কাজ করতে দিত না ওর মা।বলত "কোকিলার কাছে যা,দেখগে যদি ওর ঘটে একটু বোধ ঢোকে।" কি করে ভুলে যাবে সে?কোকিলা তোৎলা ঠিকই কিন্ত বড্ড সরল খুব ভাল মেয়ে।যে যা বলে তাই বিশ্বাস করে।তাই ওকে সবাই আধা পাগল বলে।কিন্ত ওতো পাগল নয়।
     আবার সংঘর্ষের দিন শুরু হল।বিমলার বয়স বাড়লেও সে কাজ জানে কিন্ত কোকিলা তো কোন দিন কাজ করে নাই।তবুও দুজনে অনেক কষ্টে ছেলেকে মানুষ করতে লাগল।কে বলবে ওরা ননদ ভাইবৌ।ওরা যেন এক নাড়ীর দুই বোন। ওদিকে বনোজের আরো দুটো ছেলে হয়েছে।বাড়ী গাড়ি হয়েছে।শোনা যায় এক বার ওদের যেতে বলেছিল। কিন্ত ওরা যায়নি। কোকিলাকে জিজ্ঞেস করলে বলত ক্যা--আবো,আ--দের মা--সান--আই।(কেন যাব আমাদের মান সম্মান নাই?)
একদিন ওদের ও দিন ফিরে এল। ছেলে ভাল একটা চাকরি পেল।ওকে বিয়ে দিয়ে সুন্দর একটা বৌ নিয়ে এল।কিন্ত তারপর বিমলা বেশিদিন বাঁচলো না। বিমলা কোকিলার  জীবনে ওর মা বাবা বন্ধু  দিদি- সব কিছু ছিল। ওর সব মনের কথা বুঝত। বিমলা না থাকায় কোকিলা ভেঙ্গে পড়ল।ছেলে বৌ মায়ের যত্নের কমি রাখেনি।কিন্ত যে কোকিলা নিজের মা বাবার  মৃত্যুর শোক  সহ্য করে নিয়েছিল,  সে বিমলার মৃত্যুর শোক সামলাতে পারল না।সে যে বিমলার মনুষ্যত্ব,মানবিকতা,
,ভালবাসাকে কিছুতেই ভুলতে পারল না।
তাই কিছুদিনের মধ্যেই সেও সব কিছু ত্যাগ করে বিমলার কাছে চলে গেল। 
                      সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

অসিত কুমার পাল--নারী জীবনের সার্থকতা

অসিত কুমার পাল-- নারী জীবনের সার্থকতা ____________________ সমীরণ একটা বখে যাওয়া ছেলে, বয়স চব্বিশ পঁচিশ । তার বাবা ফুটপাতের খুচ...