---নারায়ণ রায়
ঋতাভরীর আজ সকাল থেকেই শুভব্রতর কথা খুব বেশি বেশি করে মনে পড়ছে। শুভব্রত, যে ছিল ওর জীবেনর একমাত্র স্বপ্ন। শুভব্রতর তো কোন দোষ ছিলনা! সে তো ঋতাভরীকে বিয়ে করার জন্য সবকিছু ত্যাগ করে চলে আসতেও রাজী ছিল, একদিন তো মজা করে বলেইছিল, 'জানো, আমাদের যদি ছেলে হয়, তোমার আর আমার নাম মিলিয়ে তার নাম রাখবো, ঋতব্রত'। 'আর যদি মেয়ে হয়', জানতে চায় ঋতা? 'সে তখন দেখা যাবে', বলে শুভব্রত।
কিন্তু ঋতার বাবার আকস্মিক মৃত্যুটাই ওর জীবনটাকে বদলে দিল। চার ভাইবোনের বড় ঋতাকেই সংসারের দায়িত্ব নিতে হ'ল, দেখতে দেখতে সময় চলে যায়, ঋতার আর বিয়ে করাটা হয়ে ওঠেনি। আজ ভাইবোনেরা সবাই প্রতিষ্ঠিত। মা-ও গত হয়েছেন দুবছর হ'ল। চাকরি থেকে অবসর নিয়ে বাষট্টি বছরের ঋতা এখন সম্পূর্ণ একা। চাকরি জীবনে ওকে অনেকেই প্রপোজ করেছিল কিন্তু মেয়েদের মনটা কি অদ্ভূত! কেউ প্রপোজ করলেই ওর চোখের সামনে শুভব্রতর শিশুর মত মুখটা ভেসে উঠতো।
এক বন্ধুর মারফত খবর পেয়েছিল, শুভব্রত বাবা-মায়ের দেখে দেওয়া একটি অতি সাধারণ ঘরের মেয়েকে বিয়ে করে, এক সন্তান সহ এই শহরেই সুখে সংসার করছে। ঋতা ইচ্ছা করেই যোগাযোগ করেনি। সে চায়নি তার দীর্ঘদিন ধরে বুকের মধ্যে লালিত কৈশোরের ভালবাসাটুকু নষ্ট করে দিতে।
তবুও কেন জানে না, অবসরের পর একার সংসারে শুভব্রতর সেই পঁচিশ-তিরিশ বছরের মুখটা ঋতার বড্ড বেশি করে মনে পড়ে। একটা ছোট্ট দুকামরার ফ্লাটে ঋতার একার সংসার। দুবেলা নিজের জন্য দুমুঠো রান্না, সারাদিন বই পড়ে আর জর্জদা, মোহরদি এবং সুচিত্রা মিত্র শুনেই দিনগুলো কেটে যায়।
পাড়ার ব্যাঙ্কে মাসের প্রথম দিকটায় বড্ড ভীড় হয়।
প্রতি মাসের মত এই মাসেও ঋতা ছ'তারিখে ব্যাঙ্কে এসেছে পেনশনের টাকা তুলতে। চেকটা হাতে নিয়ে ক্যাশের লাইনে মাত্র চার পাঁচজনের পিছনে দাঁড়ালো ঋতা।
লাইনের পাশেই সোফায় বসে একটি বছর পঁচিশ ছাব্বিশের ছেলে আপন মনে তার মোবাইলে গেম খেলে যাচ্ছে। ঋতা লাইনে দাঁড়াতেই ছেলেটি এক লাফে উঠে এসে বললো, 'আন্টি, লাইনে তোমার আগে কিন্তু আমি আছি', বলেই ছেলেটি আবার সোফায় বসে তার মোবাইল গেমে মনোনিবেশ করলো।
ঋতা অবাক হয়ে ছেলেটিকে দেখতে লাগলো, মাথা ভর্তি একমাথা অবিন্যস্ত চুল, চোখ দুটো কি বুদ্ধিদিপ্ত, একটা ব্লু জিনসের উপর হলুদ গেঞ্জী পরা উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের ছেলেটির মুখখানা কি মিষ্টি! আর এখনকার ছেলেগুলোও কি স্মার্ট। কত সহজেই তারা একজন অপরিচিতা কে 'আন্টি' বা 'তোমার' বলে সম্বোধন করতে পারে! ঋতার মনে হ'ল ছেলেটি যেন ওর কত দিনের চেনা, যেন কত আপনজন। এইসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ঋতা লক্ষ্য করলো, লাইনে ঋতার সামনের ভদ্রলোকেরও পেমেন্ট হয়ে গেল।
হঠাৎ গেম খেলা ছেলেটি এক লাফে কাউন্টারে পৌছে ঋতার দিকে তাকিয়ে একটু সম্ভ্রমের হাসি হেসে হাতের চেকটা কাউন্টারে দিয়ে দিল। কাউন্টারের ভদ্রলোক তার কর্তব্য-মত একবার চেকটার দিকে তাকান আবার পরক্ষণেই কম্প্যুটারের বাটন টেপাটিপি করে মনিটরের দিকে তাকান। তারপর ছেলেটিকে উদ্দেশ্য করে মুখের মাস্কটা নামাতে বলেন। ছেলেটি মাস্কটি নামাতেই তাকে জিজ্ঞেস করেন 'এই শুভব্রত চট্টোপাধ্যায় কে'? ছেলেটি উত্তর দেয় 'আমার বাবা'।
ঋতাভরী চমকে ওঠে, ঋতার মাথাটা ঝিম ঝিম করে ওঠে, চোখ দুটো বুজে আসে। ঋতা
যেন নিজের দুটি পায়ের উপরে দাঁড়িয়ে থাকার জোর হারিয়ে ফেলে। ওদিকে ছেলেটি সেটা লক্ষ্য করেই পেমেন্টের টাকাগুলো না গুণেই পকেটে রেখে দিয়ে, পরের জনকে লাইন ছেড়ে দেয় এবং ঋতাভরীকে ধরে ধরে সোফায় নিয়ে বসিয়ে দিয়ে বলে, 'আন্টি তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে? তোমার তো পেমেন্ট নেওয়াই হ'ল না! তোমাকে কি বাড়ি পৌছে দেব?'
'না না, আমার শরীর একদম ঠিক আছে। তুমি আমার জন্য একদম চিন্তা কোরো না বাবা! আমার জন্য দেরী কোর না। তুমি এসো বাবা। আচ্ছা তোমার নামটা কি যেন বললে?'
ছেলেটি সুস্পষ্ট উচ্চারণে বলল, 'ঋতব্রত'।
No comments:
Post a Comment