Sunday, 7 August 2022

মুক্তি--পিনাকী দত্ত

মুক্তি--
পিনাকী দত্ত

সকাল থেকেই আকাশটা কেমন গোমড়া মুখো হয়ে আছে। বীরেন্দ্রেরও মনের আকাশে কালো মেঘ জমেছে। দুদিন তো কম ধকল গেল না শরীর ও মনের উপর দিয়ে। হাসপাতাল বাড়ি করতে করতে সে হাঁপিয়ে উঠেছিল। আজ একটু শান্তি। সকালেই হিয়াকে ডাক্তার ছুটি দিয়েছেন। কিন্তু খুব যত্নে রাখতে পই পই করে বলে দিয়েছেন ডক্টর রায়। দুপুর থেকে সারাক্ষণ সে হিয়ার বিছানার পাশেই ছিল, হিয়া একটু ঘুমিয়ে পড়তেই বীরেন্দ্র আজ একটু ব্যালকনিতে বসলো। কতদিন সে বসে না বলার চেয়ে, বসার সুযোগ পায় না বলাই ভালো। কারণ একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সে গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই তার গুরুদায়িত্ব। খোলা আকাশের দিকে তার তাকানোর অবকাশ কোথায়?
আজ সময় যখন পাওয়া গেছে তখন প্রকৃতির রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধ সে চেটেপুটে নিতে চায়। সন্ধ্যা প্রায় হয়ে এলো....
টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। বীরেন্দ্র  নিজের মনে মনে গুনগুন করে উঠলো,
 "রজনী শাওন ঘন      ঘন দেয়া গরজন 
            রিমিঝিম শবদে বরিষে।"

এক সময় সে ভালো গান গাইতো। কিন্তু চাকরিতে ঢোকার পর সেই পাঠ কবেই চুকে গেছে। অবশ্য  সমরেন্দ্রই এই ধারাটি টিকিয়ে রেখেছে এখনও।

হঠাৎই চমক ভাঙল বীরেন্দ্রর। চমকে উঠে দেখল হিয়া কখন তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। চোখ থেকে টপটপ করে জল পড়ছে। বীরেন্দ্র বাঁধা দিল না। কারণ সে জানে হিয়ার ভিতর যে গ্লানি, যে অনুশোচনা জমে আছে সেটাই চোখের ধারা বেয়ে নেমে আসছে।

বীরেন্দ্র ও সমরেন্দ্র দুই ভাই। দুজনেই Bright student, দুজনেরই bright career wait করে আছে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে সমরেন্দ্র সমাজ সেবার কাজে নিজেকে সমর্পণ করে দিল। 
পুরুলিয়া, চাঁইবাসা, ঝাড়গ্রাম এলাকার পিছিয়ে পড়া মানুষদের এগিয়ে আনার দায়িত্ব নিল। সে আত্মভোলা, বিষয়াসক্তি শূন্য। ফলে তাঁর মানিয়ে নিতে অসুবিধা হলো না। শুধুমাত্র তখনই সে বাড়ি ফিরতে যখন তার অর্থের প্রয়োজন হত। ততদিনে বীরেন্দ্র ভালো চাকরিতে Join করেছে। কাজেই নির্দ্বিধায় সে বাড়িতে  এসে দাদার কাছে হাত পাতত।
দাদা কিছু বলতে গেলেই সে গেয়ে উঠতো...  
 "আমি এক যাযাবর........"

ভালোই চলছিল। গোল বাঁধলো বীরেন্দ্রের বিবাহের পর।‌ নতুন সংসারে বউ হয়ে এসে হিয়া শুধু অতি দ্রুত মানিয়েই নিলো না, সবকিছু বুঝেও নিল। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো দেওরটি হয়ে উঠলো তার দুচোখের বিষ। আপদ বিদায় হলেই যেন সে বাঁচে। অবশ্য এজন্য তাকে দোষও দেওয়া যায় না। কারন সে বহু লড়াই করে আজ একটু সুখের সন্ধান পেয়েছে, তাই অপচয় "নৈব নৈব চ"। আর "সমাজসেবা" ওসব গালভরা নাম তার দুচোখের বিষ।
স্বাভাবিকভাবেই সমরেন্দ্র পাঠ এ বাড়ি থেকে ঘুচলোই বলা যায়। যদিও দু'ভাইয়ের মধ্যে একটি ক্ষীন যোগসূত্র রয়েই গেল। 

দিন তিনেক আগে বীরেন্দ্র যখন অফিসে বসে খুব মনোযোগ সহকারে ফাইলগুলো চেক করছিল তখনই হঠাৎ মোবাইলটা বেজে উঠলো। দেখল ডক্টর রায়।
বীরেন্দ্র অবাক হলো। এইতো গতসপ্তাহেই তো হিয়ার Formal Check up ছিল। Pregnancy র প্রথম ধাপে যা problem হয় আর কি। সবই তো ঠিক আছে বলল। এর মধ্যে কি হলো!
হ্যালো বলতেই ওপ্রান্তে ডক্টর রায়ের গলা ভেসে এলো,
 "বীর তুই একবার আমার নার্সিংহোমে চলে আয়, It's urgent।" বলেই ফোনটা কেটে দিলেন।

বীরেন্দ্র চেম্বারে দরজা খুলে মুখ বাড়াতেই শুনতে পেলেন, "আয়! আয়! বোস। সব বিপদ কেটে গেছে। Thanks God সমর ঠিক সময়ে নিয়ে এসেছে, নইলে বাচ্চাটাকে....." 
ডক্টর রায় চুপ করে গেলেন।
বীরেন্দ্র এর মুখ থেকে অস্ফূটে শুধু বেরোলো, "সমর"!

ডক্টর রায় আবার বললেন "ওহ হ্যাঁ, হিয়াকে রক্ত দিতে হয়েছে, সমরই অবশ্য রক্ত দিয়ে সেই Problem solve করে দিয়েছে।"
এখানে বলে রাখা দরকার স্বনামধন্য গাইনোকোলজিস্ট ডক্টর রায়, বীরেন্দ্র ও সমরেন্দ্র একই স্কুলের ছাত্র হওয়ার সুবাদে পরস্পরের পূর্বপরিচিত এবং তাদের সম্পর্কটা তুই-তোকারির।

ডক্টর রায় বললেন, "যা একবার দেখে আয় হিয়াকে, আর কিছু অফিসিয়াল ফর্মালিটিস আছে যাওয়ার সময় করে দিস। আর সমর এই চিঠিটা তোকে দিতে বলেছে।" 

ক্লান্ত বিধ্বস্ত বীরেন্দ্র চিঠিটা খুলল,

দাদা, 
আমি নিরুদ্দেশ যাত্রায় বের হওয়ার সংকল্প করেছি। তুই তো জানিস, "আমার পথ চলাতেই আনন্দ"। তাই যাওয়ার আগে নিজেদের ভিটেটা একবার দেখে যেতে এসেছিলাম, ইচ্ছে হল। আর হ্যাঁ তোকে না বলেই মা-বাবার সাথে তোর আমার পুরীর ছবিটা নিয়ে গেলাম।

পুনশ্চ:- তোর গাড়িটা একবার ভালো করে ধুয়ে নিস । ওতে অনেকটা রক্ত লেগে আছে।

                          ইতি
              বিশ্বপথিক সমরেন্দ্র

No comments:

Post a Comment

অসিত কুমার পাল--নারী জীবনের সার্থকতা

অসিত কুমার পাল-- নারী জীবনের সার্থকতা ____________________ সমীরণ একটা বখে যাওয়া ছেলে, বয়স চব্বিশ পঁচিশ । তার বাবা ফুটপাতের খুচ...