বিশ্বরূপা ভট্টাচার্য
দীপমালা, তুমি গভীর অনুভূতিসম্পন্ন। তোমার রোমান্টিকতা আমাকে স্পর্শ করেছে।
দীপমালা বিস্ময়ে হতবাক।কি শুনছে!এও সম্ভব? এতো পরিবর্তন!
******************************************
নতুন অফিসে আজ প্রথম দিন।
_ভিতরে আসবো স্যার?
_আরে এসো দীপমালা, বোসো।
বসের মুখে কাষ্ঠ হাসি, চশমা নাকের ডগায়,লালচে চোখে ধূর্ত চাহনি।
_রেজাল্ট তো ভালোই।মন দিয়ে কাজ কোরো।
_অবশ্যই স্যার
_গান জানো?
_সামান্য
_ওতেই হবে।বিশেষ দিনগুলোতে ছোটোখাটো প্রোগ্রাম অ্যারেঞ্জ করবে, গান গাইবে,ওকে?
_ওকে স্যার, আগের অফিসেও করেছি।
_গুড,অফিসে কে কি করছে, আমার নামে কি বলছে,সব খবর আমাকে দিও।
_সরি স্যার,আমি ইনফর্মার নই।
_রাবিশ! এখানে কাজ করতে গেলে এটুকু করতেই হবে।
_পারবো না স্যার
_তাহলে কোনোদিন আমার থেকে কোনো হেল্প পাবে না,মাইন্ড ইট।
বসের মুখে নকল হাসি,চোখে ক্রুর দৃষ্টি।
ঘর থেকে বেরিয়ে দীপার দুচোখ ছলছল...
আগের অফিসের স্মৃতিগুলো ভীষণ টাটকা...
একসাথে কাজ, আনন্দ...
_দীপা, আজ বৃষ্টির দিনে সবার জন্য খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা, চলবে তো?
_দীপা, জগদ্ধাত্রী ঠাকুর দেখতে চলো,তোমার বৌদি আর ভাইপোও যাচ্ছে।
**************************************
_স্যার, অ্যাপ্লিকেশন এনেছি ম্যাটার্নিটি লিভের।
_এতো তাড়াতাড়ি?
_আমি খুব অসুস্থ
_আগে হাসব্যান্ডকে আনো।শংকর যদি জানে অর্কর পিছনে ঘুরঘুর করছো,কি হবে?
_ছিঃ, কি বলছেন!
_ছুটির পর থেকো,দরকার আছে।
পৌনে সাতটায় বেরোলো দীপমালা--ক্ষুধার্ত, শ্রান্ত, পেটে যন্ত্রণা,মানসিকভাবে বিধ্বস্ত।তনিমাদি বসকে প্লেটভর্তি ফল দিয়ে যায়।বসের পাশে এক সহকর্মী, এক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কর্ণধার।মানসিক নির্যাতন চলে গর্ভবতীর ওপর।
শেষ অটোতে বাড়ি ফিরে রাতে ব্লিডিং, সারারাত কান্না;ডাক্তারের ওষুধে,বেডরেস্টে অবশেষে বাঁচলো ভ্রূণ।
******************************************
_সুযোগ নিচ্ছি? তোমার অসহায়তার? একাকীত্বের? না দীপমালা, এটা প্রাণের সম্পর্ক।তুমি পাথরে প্রাণ সঞ্চার করেছো।
_কিন্তু এতো বছরের দন্দ্ব, সংঘাত?
_ভুল করেছি।অন্যদের কথায় মূর্খের মতো দুজনে লড়াই করেছি।তোমার স্ট্রাগল, তোমার সারল্য, সততা, দায়িত্ববোধ,শিক্ষা,সংস্কৃতি আমাকে মুগ্ধ করেছে।তোমাকে প্রবল ভালোবেসেছি, দীপমালা।একটু ভালোবাসা দেবে আমায়?
ফোনের অন্যপ্রান্তে দীপমালা স্তব্ধ। একদিকে বসের স্বীকারোক্তি, আমূল পরিবর্তন, আকুল প্রেমের আহ্বান;অন্যদিকে এতো বছরের হেনস্থা, অপমানের যন্ত্রণা।শেষমেশ দৃঢ়চেতা দীপমালা প্রত্যাখ্যান করে বসকে।ওপ্রান্তে বসের করুণ দীর্ঘশ্বাস!
==================================
[8/6, 10:41] +91 94243 06671: গল্প :
নারী জীবনের সার্থকতা
____________________
সমীরণ একটা বখে যাওয়া ছেলে, বয়স চব্বিশ পঁচিশ ।
তার বাবা ফুটপাতের খুচরো ব্যবসায়ী, মা পাড়ার এর ওর বাড়িতে টুকটাক কাজ করে সংসারটা কোনরকমে চালিয়ে নেয় । সমীরণ ইস্কুলে ভর্তি হয়েছিল বটে , পড়ায় মন না থাকলেও পাশ ফেল না থাকার সুযোগে ক্লাস এইট পর্যন্ত উঠেছিল । কিন্তু তারপরে তাকে স্কুল ছাড়িয়ে একটা মুদিখানার দোকানে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল । মাসকয়েক পরে দোকানের টাকা চুরি করতে গিয়ে সে ধরা পড়ে । সেই থেকে আর কেউই তাকে কাজে রাখতে চাইল না ।
তারপরে অন্য কোন কাজের চেষ্টা না করে সমীরণ পাড়ার ক্লাবে গিয়ে ক্যারাম পেটে নয়তো মেয়েদের ইস্কুলের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে সময় কাটাতে থাকে । আরো কিছু বখাটে ছেলের পাল্লায় পড়ে সে মদ গাঁজা খেতেও শিখে গেল । নেশার পয়সা জোগাড় করতে কখনো সে বাবার তবিল থেকে চুরি করত আবার কখনো রাতে কারো বাগান থেকে নারকেল কলা কাঁঠাল ইত্যাদি চুরি করে সস্তায় কাউকে বেচে দিত । বার দুয়েক চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে তাকে চড়থাপ্পড় খেতেও হয়েছে । মেয়েদের পিছনে ঘুরঘুর করলেও তার কালো রোগাটে চেহারা আর নোংরা পোশাক দেখে কেউ তাকে পাত্তা দিত না ।
রমলা সমীরনের গ্রামেরই মেয়ে তবে অন্য পাড়ায় থাকে । বাবা নেই , মা লোকের বাড়িতে কাজ করে । বয়স ত্রিশ পেরিয়ে গেলেও গরীব ঘরের কালো রোগাটে মেয়ে বলে বিয়ে দেওয়া যায়নি । বছর কয়েক আগে সে শহরের এক নার্সিং হোমএ আয়ার কাজ জোগাড় করেছে । রোজ দুপুরে বাস ধরে শহরে যায় আর রাত আটটা নাগাদ ফিরে আসে , কোন কোনদিন একটু দেরীও হয়ে যায় । বাসরাস্তা থেকে গ্রামে ঢুকতে খানিকটা জঙ্গুলে জায়গা আছে , কাছে একটা ভাঙাচোরা চালাঘরও আছে । রাতের অন্ধকারে সে জায়গাটা পার হতে অনেকেই ভয় পায় । কিন্তু রোজ ওই রাস্তা দিয়েই ফিরতে হয় বলে রমলা ব্যাগে একটা ছোট টর্চ রেখেছে ।
একদিন বিকালে সমীরণ বাসরাস্তার মোড়ে অন্য কয়েকজন বন্ধুর সাথে আড্ডা দিচ্ছিল । সন্ধ্যে নাগাদ কাল বৈশাখীর ঝড় শুরু হল , একটু পরে মুষলধারে বৃষ্টিও নামল । সমীরণ ও তার বন্ধুরা দেশী মদের দোকানে ঢুকে দু বোতল মদ ওড়াল । রাত সাড়ে নটা নগদ সেখান থেকে বেরিয়ে দেখল তখনও ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে , বিদ্যুতের চমকানি থেমে গেছে । ভিজে ভিজেই বাড়ির রাস্তা ধরবে কিনা ভাবছিল এমন সময়ে সমীরণ দেখতে পেল রমলা বাস থেকে নেমে বাড়ির পথ ধরেছে । তার সঙ্গে ছাতা আর টর্চ থাকলেও টর্চের আলোয় তেমন জোর নেই । সমীরণ খানিকটা দূরত্ব রেখে রমলার পিছনে পিছনে চলল ।
নানারকম গাছপালায় ভর্তি অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গার কাছে এসে রমলার টর্চ একেবারে নিভে গেল । সমীরণ বড়বড় পা ফেলে রমলার কাছে এসে পিছন থেকে তাকে জাপটে ধরল । রমলার হাতের ছাতা কোথায় উড়ে গেল , টর্চটাও পড়ে গেল । সমীরণ রমলাকে ধরে জঙ্গলের ভিতরে একটা ভাঙ্গা চালাঘরে নিয়ে তুলল । অন্ধকারে কেউ কারো মুখ দেখতে পাচ্ছিল না বলে রমলা তার আক্রমণকারীকে চিনতে পারল না । রমলা বাঁচাও বাঁচাও করে চিৎকার করল , কিন্তু কাছাকাছি কেউ থাকে না বলে তার ডাক কেউ শুনতে পেল না । সমীরণ অন্ধকারেই রমলাকে চালাঘরের বারান্দায় ফেলে তার উপরে চেপে বসল । রমলা নিজেকে বাঁচানোর প্রাণপণ চেষ্টা করেও বিফল হল এবং শেষে আত্মসমর্পন করল ।
বেশ কিছুক্ষণ ধরে রমলার উপরে শারীরিক অত্যাচার চালানোর পরে বেহুঁশ রমলাকে সেখানেই ফেলে রেখে সমীরণ পালিয়ে গেল । আরো কিছুক্ষন পরে জ্ঞান ফিরে পেয়ে রমলা কোন রকমে উঠে বসল , তার শাড়ি সায়া ছিঁড়ে গেছে , জলে কাদায় মাখামাখি হয়ে আছে । শরীরে অসহ্য বেদনা থাকায় আরো কিছুক্ষণ সেভাবেই বসে রইল তারপরে উঠে দাঁড়িয়ে শাড়িটা কোন রকমে জড়িয়ে নিল । বৃষ্টিটা তখন ধরে গেছে । অন্ধকারের মধ্যেই রমলা চালাঘরের বারান্দা থেকে নেমে হাতড়ে হাতড়ে গ্রামের রাস্তার দিকে এগিয়ে চলল । আবছা অন্ধকারে ছাতা বা টর্চ খুঁজে পেল না । ধীর পায়েই সে নিজের বাড়ির দিকে চলল । বাড়ি পৌঁছে সে তার মাকে জানাল অন্ধকারে পা পিছলে রাস্তার ধারে একটা খানায় পড়ে গিয়েছিল ।
আশপাশের কেউই সে রাতের ঘটনার কথা টের পেল না । সমীরণএর কাজকর্মে ও আচরনে কোন পরিবর্তন দেখা গেল না । রমলা আগের মতোই সহরের নার্সিং হোমএ যাতায়াত করতে লাগল ।
মাস দুয়েক পরে রমলা টের পেল তার গর্ভে সন্তান এসেছে । বয়স ত্রিশ পেরিয়ে গেলেও তার বিয়ে হয়নি এমনকি তার কালো রোগাটে চেহারা দেখে কেউ তার সাথে প্রেম করার চেষ্টাও করেনি বলে এতদিন পর্যন্ত সে কুমারীত্ব বজায় রেখেছিল । ঝড়জলের রাতে অচেনা লোকটি জোর করে তার কুমারীত্ব নষ্ট করায় তার নারী জীবন সার্থক হয়েছে । কিন্তু কুমারী মেয়ে গর্ভবতী হওয়ার খবর জানাজানি হলে গ্রামে তার ও তার মায়ের বাস করা কঠিন হবে । অতএব তার গর্ভের সন্তানকে নষ্ট করে ফেলা দরকার । নার্সিং হোমএর ডাক্তার নার্সের মাধ্যমে গর্ভপাতের ওষুধ জোগাড় করাও কঠিন হবে না ।
No comments:
Post a Comment