Monday, 8 August 2022

হোলির রঙে--স্বপ্না মজুমদার


হোলির রঙে--
স্বপ্না মজুমদার 



সেবার সুমি খুব আনন্দ করতে চেয়েছিল বসন্ত উৎসবে।
আবির মাখতে,,মাখাতে ভালোবাসতো।সুমি বলতো,
---- এসো না দিপ্তেন। তুমি এমন সরে থাকো কেনো।
আজ আবির মাখার দিন।কতো রঙের আবিরে হবো রঙীন।
------- তুমি এতো আবির খেলতে ভালোবাসো কেনো সুমি।
নীরব , উদাসী হয়ে পড়ে সুমি কিছুক্ষন।তারপর মুখে হাসি এনে বলে।
------ আমি রঙিন হতে চাই,দিপ্তেন।তোমাকেও রঙিন করতে চাই।জানো আজ এই আবির মাখা হোলির দিনে
আবিরে রঙিন হলে।হয়তো জীবন রঙিন থাকে চিরদিন।
------ এটা বুঝি তোমার বিশ্বাস। কিন্তু ওই আবির আমার অতো মাখতে হৈ চৈ করতে ভালো লাগে না সুমি।
সুমি দৌড়ে আসে।জড়িয়ে ধরে দিপ্তেনকে,পাগলের মতো চেঁচিয়ে বলে।
------ না। না না দিপ্তেন এমন করে আর বোলো না।
আমরা রঙ মাখবো দুজনে।রঙিন হবো আজকের দিনে
আমি আর তোমাকে হারাতে ‌পারবো না।প্লিজ্ দিপ্তেন আমার সেই সাদা থান শাড়ি তুমিই তো রঙীন করেছিলে  বসন্ত পলাশ লাল আবিরে।
------ ভয় পেয়ো না,সুমি আর আমি হারিয়ে যাবো না।
এভাবেই তোমায় রঙে রঙিন করে‌ রাখবো। তুমি বে-রঙ
আর হবে না।
------ ওরা কেনো অমন খবর পাঠায় বলো দিপ্তেন।
তুমি হারা আমি যে অধোরা।
------- সেদিন চীনা সৈন্যদের হাতে বন্দী ‌হয়েছিলাম।
ভারতের কাছে খবর ছিল আমরা পাঁচজন মৃত।
তাই অমন খবর পেয়েছিলে। তাছাড়া তুমি একজন
সিপাহীর স্ত্রী। তুমি এভাবে কাঁদবে কেনো।মনকে শক্ত রাখো সুমি। তোমার তো গর্ব অনুভব করা উচিত।
----- গর্ব অনুভব ‌তো করি,দিপ্তেন তোমার কতো বড়ো দায়িত্ব। দেশের কাজ করো। দেশের ‌সীমানায় তুমি 
সীমান্ত রক্ষী। তোমার পোশাক, হাতে রাইফেল।এ ছবি আমকে গর্বিত করে, ঠিক তবু শূন্য জীবন তুমি ছাড়া,
কিছু দিনের শূন্য অনুভূতি তো পেয়েছি। না দিপ্তেন সে বড়ো কষ্টের।মন বলতো তুমি আসবে।
----- এলাম তো ফিরে।অতো টর্চার সহ্য করেও বেঁচে আছি।এখন অনেকটা সুস্থ।এবার আবার ফিরতে হবে।
-------- জানি তুমি আবার সেখানে ‌যাবে। মনে আছে দিপ্তেন,সেবার আমাদের বীরভূমের বাড়িতে। আমি তো বে- রঙিন জীবনে ছন্দ হারিয়ে চোখের জলে দিন কাটাচ্ছিলাম। দাঁড়িয়ে দেখছিলাম সকলের হোলি খেলা।সেবার তুমি এসেছিলে আমাদের গাঁয়ে।
------ হ্যাঁ।সব মনে আছে সুমি। তোমাদের গাঁয়ে আমার মামার বাড়ি।আমার মা অনেকদিন ধরে সেখানে যেতে চাইছিল। তাই ছুটিতে বাড়ি এসে মাকে নিয়ে গিয়েছিলাম মামার বাড়িতে।মামার বাড়ির বারান্দা থেকে তোমায় দেখতাম।ভাবতাম ওই রঙহীন সাদা প্রিন্টের শাড়ি তোমাকে মানায় না।
---- জানি।সব মনে পড়ে, আমার। সুরঞ্জনকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। বেশ সুখেই দিন চলছিল আমাদের। সেবার ভাইফোঁটা নিতে ওর দিদির বাড়িতে যাওয়ার পথে,খাদে বাস গড়িয়ে পড়ে।ও আর আমার তিন বছরের মেয়ে মারা যায়। অনেকেই মারা যায়।
আহতর সংখ্যাও অনেক। কিভাবে যেন আমি বেঁচে গেলাম।
না মরে বেঁচে রইলাম। জীবনটা শূন্য হয়ে গেল।
কাঁদতেও ভুলে গেলাম। খুব অসুস্থ হয়ে মায়ের কাছে ফিরলাম। কেটে গেল দুটি বছর।বুঝতেও পারলাম না।
চিকিৎসা চলছিল।
------ থাক না ওসব কথা।আর কতো বলবে। তোমার কষ্ট বাড়বে  সুমি। আমি জানি, তুমি তোমার ভালোবাসা, তোমার সন্তানকে কোন দিন ভুলতে পারবে না।
---- হয়তো পারবো না। সুরঞ্জন বড় ভাল মানুষ ছিল যে।
তবে তুমিও তো ভীষন ভাল। তুমি আমায় রঙীন করলে আবার। আমি তোমাকে পেয়ে, তোমার ভালবাসা পেয়ে
বাঁচতে শিখলাম।
---- বেশ তো সুমি,,এবার খুশি থাকো।
----- সেই তুমিও যুদ্ধে গিয়ে হারিয়ে গেলে।সকলে বলতো আমার ভাগ্যে স্বামী সুখ নেই।
-----ওসব মানুষের কথা ছাড়ো।এই তো তুমি, আমি দুজনে বেশ ভাল আছি।সুখে আছি।
------ কিন্তু সুমি তুমি এখন একজন সিপাহীর স্ত্রী।সব জেনেই বিয়ে করেছো।তুমিই আমার প্রেরণা। তোমাকে শক্ত হতে হবে।এবার যে আমার  ফিরে যাওয়ার সময় হলো।
------ জানি তো।তাই তো আজ ফাগের হোলির রঙে দুজনে রঙীন  হতে চাই।যাতে রক্তের লাল হোলি আর না মাখতে হয়। যে আসছে  তার বাইরের পৃথিবী দেখতে দেরি আছে। আজ একসাথে তুমি আমি,তাকে নিয়ে আবির রঙে রাঙাই।
------ কি বলছো সুমি,,,,,এটা সত্যি?? বলোনি তো?

সুমিতা হাসতে থাকে। বলে,--- শুভ মুহূর্তে জানাবো ভেবেছিলাম।আজ সেই শুভ মুহূর্ত। তাই তো বললাম।
দিপ্তেন খুশিতে জড়িয়ে ধরে। বলে,---- এতো বড় খুশির খবর দিলে, কিছু তো তোমায় উপহার দিতেই হবে।
হক্ বনতা হ্যায়,। জানতে হো,সায়দ ইসি লিয়ে ভগবান নে মুঝে জীবন দান দে দিয়া।আজ ম্যায় বহত খুশ হুঁ।
----- দিপ্তেন ননবেঙ্গলী হলেও ভাল বাংলা বলে।ফিরভি,
হিন্দি মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ হ্যায়। উও তো আ হি যাতা হ্যায়।

দিপ্তেন খুশিতে যেনো পাগল। বলে,সুমি,,সত্যিই আজ আবির রঙ(রং) খেলবো। তোমায় আজ রাঙ্গিয়ে দেবো, আমার ভালোবাসার রঙে।
হোলি শেষে বেশ কিছু দিন পরে দিপ্তেন কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাওয়ার সময় বলে,,-- আজ আর তোমাকে একা রেখে যাচ্ছি না। আমার বাচ্চা রইলো তোমার কাছে।
সুমিতা হাসি মুখে বিদায় জানায় সিপাহী দিপ্তেনকে।।
                               
                                   সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

অসিত কুমার পাল--নারী জীবনের সার্থকতা

অসিত কুমার পাল-- নারী জীবনের সার্থকতা ____________________ সমীরণ একটা বখে যাওয়া ছেলে, বয়স চব্বিশ পঁচিশ । তার বাবা ফুটপাতের খুচ...