Monday, 8 August 2022

সম্পর্কের দিক পরিবর্তন--মায়া সাহা

সম্পর্কের দিক পরিবর্তন--
মায়া সাহা


আজ কিন্তু মেয়েটাকে তাড়াতাড়ি ঘুম পাড়িয়ে 
নিজেকেও প্রিপেয়ার করে রেখো। বেশিক্ষণ সময় নেওয়া যাবেনা। কাল আবার মর্নিং শিফট। 
কী শুনছো তো? 
সংসারের কাজে ব্যস্ত শর্মিষ্ঠা শরীরের ঘাম মুছতে মুছতে মাথা নাড়িয়ে সুজন কে সন্মতি জানায়। এভাবেই চিরদিন অনিচ্ছা থাকা সত্বেও ও সুজনের শারীরিক পিপাসা কে সম্মতি জানিয়ে এসেছে।  জীবনের অনেকগুলো বছর এভাবেই কেটে গেল । ও জানেনা আরও কতদিন এভাবেই কাটবে ! 

শর্মিষ্ঠা এখন হাড়ে হাড়ে বোঝে কেন দিনে দিনে  পরকিয়ার কদর এতো বাড়ছে। লোকে যতই বলুক পরকিয়া কে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া উচিৎ হয়নি। শর্মিষ্ঠা কিন্তু আজকাল এ রায়ের বিরোধী হয়ে উঠেছে। উঠবে নাইবা কেন....................
প্রায় পাঁচ বছর হল শর্মিষ্ঠার বিয়ে হয়েছে । এতোদিনের দাম্পত্য জীবনের বিন্দুমাত্র সুখ
 মুহূর্তের জন্যও ওকে স্পর্শ করতে পারেনি। ওর জীবনেও এমন কোনো সুন্দর প্রেমের মুহূর্ত তৈরি হয়নি, যে স্মৃতি মনে পড়লে ও একমুহূর্তের জন্যও সুখ অনুভব করতে পারে। অথবা স্বামী সোহাগে গদ গদ হয়ে বন্ধুদের কাছে গর্ববোধ প্রকাশ করতে পারে যে, ওর স্বামীও খুব বৌ সোহাগী  ।

তবুও গুরুজনদের মন্ত্র অনুযায়ী আত্মসুখ বিসর্জন দিয়ে স্বামীর অবহেলা অপমান সয়েও শ্বশুরবাড়িতে     বাধ্যের বৌমা হয়ে দিনযাপন করে চলেছে। আসলে এসব ই ধীরে ধীরে ওর গা সওয়া হয়ে গেছে।  

বিয়ের পর বছর খানেক মতো যদিও আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব সকলের সাথে ওর যোগাযোগ ছিল, বর্তমানে সেই  রাস্তাও বন্ধ হয়ে গেছে। 

আজ প্রায় চার বছর পর কোলকাতার আশেপাশে বসবাসকারী ওর চার বন্ধু বান্ধব ওকে সারপ্রাইজ দেবে বলে প্ল্যান করে ওর বাড়িতে বেড়াতে আসে।
  ওরা শর্মিষ্ঠার শারীরিক ও মানসিক দুরবস্থা দেখে হতবাক হয়ে যায়।  
  শর্মিষ্ঠা ওর ঘনিষ্ঠ চার বান্ধবীদের রিকোয়েস্টে নিজের জীবনের করুন কাহিনীর আসল কারণ প্রকাশ করতে বাধ্য হয় । ও জানায় যে "বিবাহিত জীবনে ও বিন্দুমাত্র সুখী নয়।,  সুজন একজন স্বৈরাচারী ও চরিত্রহীন স্বামী। ও শর্মিষ্ঠাকে স্ত্রী'র মর্যাদায় নয়, কেবল শারীরিক ও সংসারিক  চাহিদা মেটানোর যন্ত্র হিসাবে ই ব্যবহৃার করে চলেছে !বায়রে(বাইরে) ওর একাধিক গার্লফ্রেন্ড আছে ! "

আজ বন্ধুদের কাছে নিজের যন্ত্রণা শেয়ার করতে পেরে শর্মিষ্ঠা নিজকে একটু হালকাবোধ করছে। 
এখন ওর বন্ধুরাই ওর বাঁচার একমাত্র অনুপ্ররেণা.........................................

বন্ধুদের সহযোগিতায় আজকাল শর্মিষ্ঠা আধুনিক ভাবধারার সাথে নিজকে খাপ খাওয়াতে চেষ্টা করে । মাঝেমধ্যে সংসারের গণ্ডীর বায়রে গিয়ে নিজের অস্তিত্ব কে মূল্য দিতে শিখেছে। 

একদিন ওর চার বান্ধবী প্ল্যান করে ওদের সাথে আড্ডায় ডেকে নেয় শর্মিষ্ঠার অতীত প্রেমিক অমলকে । যে একসময় বেকারত্বের কারণে শর্মিষ্ঠাকে হারিয়েছিল। এতে অবশ্য শর্মিষ্ঠার কোনো দোষ ছিলনা। ও অমলের জন্য অপেক্ষা করতে চেয়েছিল আজীবনকাল। কিন্তু যে বেকার প্রেমিকের অনিশ্চিত ভবিষ্যত, সে কিভাবে প্রিয়জনের জীবনটা নষ্ট করার দায়িত্ব নেয়! 
হায়রে সুখ ! অমলের কি আর জানা ছিল দুমুঠো পেটভরে খাওয়া আর রাজমহলে থাকার নাম সুখ নয়!

 শর্মিষ্ঠার অসুখী জীবনের চেহারা অমলকে খুব কষ্ট দেয়। ওর জীবনের এমন পরিস্থিতির জন্য অমল নিজকে ই দায়ী ভাবে এবং এরজন্য শর্মিষ্ঠার কাছে ক্ষমা চায়। 
শর্মিষ্ঠা কাঁদতে কাঁদতে বলে, "কেন আমাকে সেদিন ফিরিয়ে দিলে"? আমি তো তোমার জন্য অপেক্ষা করতে চেয়েছিলাম !
সত্যিই যদি সেদিন অমল শর্মিষ্ঠাকে ফিরিয়ে না দিত আজকের প্রতিষ্ঠিত জীবনে শর্মিষ্ঠাকে নিয়ে হয়তো অমলও সুখী হতে পারতো। 
আজ অমলের কাছে গাড়ি বাড়ি সবই আছে কিন্তু ওর পরিবার নেই।  বিয়ের এক দু'মাস পরেই ওর স্ত্রী রিমলি ও'কে ছেড়ে চলে যায়। আসলে রিমলির অমতে ওর বাড়ির লোক অমলের সাথে এই বিয়েটা একপ্রকার জোর করেই  দিয়েছিল। অমল সেকথা রিমলির কাছ থেকে জানতে পেরে রিমলিকে স্বইচ্ছায় ডিভোর্স দেয়। সেই  থেকে অমল নিঃসঙ্গ জীবন পালন করে।

আজকাল অফিস ছুটির পর বন্ধুদের সাথে প্রায়দিনের আড্ডায় অমলও যোগদান করে। সেখানে শর্মিষ্ঠাও উপস্থিত থাকে। 
 অমল আর শর্মিষ্ঠার সম্পর্ক আগের ছন্দে ফিরতে থাকে । শর্মিষ্ঠা আর অমল ওরা দুজনে ই আজকাল বেশ প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।  সমস্ত অপরাধবোধ কাটিয়ে অমলকে নতুন করে ফিরে পেতে  শর্মিষ্ঠার মন ব্যাকুল হয় । এখন ও মনে মন ভাবে হোকনা যতই সামাজিক গুঞ্জন ! যেখানে  পবিত্র হৃদয়ের বন্ধন সেখানেই যদি মেলে সুখের সাগর  ! 

 এভাবে চলতে চলতে প্রায় একবছর পর 
নিঃসঙ্গ অমল একসময় শর্মিষ্ঠাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। আধুনিক শর্মিষ্ঠা সমস্ত দিধা উপেক্ষা করে ওর একমাত্র কন্যা সন্তান কে নিয়ে অমলের সাথে সুখের সংসার গড়ে। 

ওরা দুজনেই উপলব্ধি করে মূল্যবান জীবন তার জন্যই উৎসর্গ করতে হয়, যাঁরা একে অপরের জীবনকে  মূল্য দেয়। 


No comments:

Post a Comment

অসিত কুমার পাল--নারী জীবনের সার্থকতা

অসিত কুমার পাল-- নারী জীবনের সার্থকতা ____________________ সমীরণ একটা বখে যাওয়া ছেলে, বয়স চব্বিশ পঁচিশ । তার বাবা ফুটপাতের খুচ...