পিঙ্কু চন্দ
হঠাৎ করেই সুরেন কবিয়ালের মৃত্যু হলো।তার আকস্মিক মৃত্যুতে স্ত্রী বিজয়া দেবীর মাথায় যেন পুরো আকাশটাই ভেঙ্গে পড়লো। স্বামীর ঘর বা বাপের ঘরে এমন কেউ নেই যে তার পাশে এসে দাঁড়াবে।সহায় সম্বল হীন বিজয়া দেবী আট বছরের ছেলে সুজন আর চার বছরের মেয়ে তপতীকে নিয়ে স্বামীর ভিটে আঁকড়ে রইলেন। আষাঢ়ে মেঘ ঘন আকাশটাকে মাথায় নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।বছর তিরিশের সদ্য বিধবা নারী চিল শকুন তাড়িয়ে বীরাঙ্গনার মতো জীবন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
কবিয়াল স্বামী দঁন্ত মাজন তৈরি করে গাঁয়ের হাঁটে বিক্রি করতেন। বাপের ঘরে শিখে ছিলেন বাঁশের কাজ।এখন এগুলোই হলো তার জীবিকার অবলম্বন।ভাঙ্গা গড়ার খেলা খেলতে খেলতে সময় আর নদী বয়ে চলে নিজস্ব টানে। এভাবে অনেক গুলো যোগ বিয়োগের মধ্য দিয়ে কেটে গেল কুড়ি বছর।
বিজয়া দেবী এখন বাতের ব্যথায় পঙ্গু। তবু ব্যাথা ছাড়িয়ে এক তৃপ্তির হাসি তার মুখ মণ্ডল আলোকিত করে।এটা অহঙ্কার নয়, প্রত্যয়ের আলো। দরিদ্রতার সাথে লড়াই করে সন্তান দেরে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেছেন।সুজন বি. এ.পাশ করে একটা দৈনিক পত্রিকার সাব এডিটর।তপতীও বি.এড পাশ করে একটা স্কুলে শিক্ষকতা করে।
সূর্য ওঠে সূর্য ডুবে। দিনের পর দিন আসে নিত্য নতুন কলরবে।আজ উনিশ মে। উনিশশো একষট্টির এই দিনে শিলচর রেলওয়ে স্টেশনে মাতৃভাষা বাংলার অধিকার রক্ষার সংগ্রামে পুলিশের গুলিতে এগারো জন শহিদ হন। এদিন বরাক উপত্যকা জুড়ে ভাষা শহিদ দিবস উদযাপন করা হয়। মানুষ জিরাফ নয়, তাই ভাষার দাবি উঠবে।
একষট্টির ভাষা আন্দোলন সুজন দেখেনি। দেখেনি বাহাত্তরের ভাষা আন্দোলন। তবে দেখেছে ছিয়াশি সালের ভাষা আন্দোলন। একুশে জুলাই করিমগঞ্জে জগন যিশু শহিদ হন। সেদিন সুজন কলেজে গেছে।জানা ছিল মুখ্যমন্ত্রী আসবেন। তাই ছাত্ররা তার জারি করা ভাষা সার্কুলারের প্রতিবাদে কালো পতাকা দেখাবে। সুজন সেই মিছিলে যোগ দিল।হঠাৎ গুলি শুরুহলো।লুটিয়ে পড়লো জগন যীশু। মিছিল ছত্র ভঙ্গ।যে যেদিকে পারে ছুটলো।সুজনও ছুটলো। মুহুর্তে শহর নিস্তব্ধ।জারি হলো কার্ফু।কালো বাদুড়ের ডানার ভেতর ঘুমিয়ে পড়লো দিনের শহর।
শহরের গুলির খবর লক্ষ কথার ঢেউ হয়ে ছড়িয়ে পড়লো গ্রামে। সুজনের মা দুশ্চিন্তায় কাঁদতে লাগলেন। উৎকণ্ঠার প্রহর।উৎকণ্ঠায় বিজয়া দেবীর বাতের ব্যাথা বেড়ে গেলো।তপতী কে বার বার ডেকে বলেন, 'কিরে সুজনের খবর পেলি? ' তপতী ঘর বার করছে।কিন্তু কোন খবর নেই।সে সময় গাঁয়ে ফোন ছিল না।
সুজন সেদিনের কথা কিছুই ভুলেনি।অনেক ক্ষণ লুকিয়ে থাকার পর এক সময় চুপি চুপি অনেক গলিগুজি পেরিয়ে বেরিয়ে এলো শহর থেকে।তার পর অনেক অচেনা ঘোর পথে জল কাদা ভেঙ্গে সন্ধের অনেক পর ঘরে ফিরলো। মা তাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কেঁদে ছিলেন।
# # #
আজ উনিশ মে'র শহিদ দিবসের মুল অনুষ্ঠানে অনেক বক্তা বক্তব্য রাখেন।সুজন সেই অনুষ্ঠানের রিপোর্ট তৈরি করে অফিসে জমা দিয়ে বেরিয়ে পড়লো মায়ের জন্য ঔষধ কিনতে।বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত।
বাড়ি এসে সুজন দেখলো তুলসী তলার পাশেই জ্বলছে এগারোটি প্রদীপ।প্রতি বছরের মতো এবারও মা এগারোটি প্রদীপ জ্বালিয়েছেন।ঘরে ঢুকতেই মায়ের ডাক 'সুজন এলি'।
_ হ্যাঁ মা।
সুজন মায়ের ঔষধ টেবিলে রাখলো। তপতী এসে বললো 'জানিস দাদা মা আজ সারাদিন "উনিশের পদাবলী" বইটা নিয়েই কাটিয়ে দিল'। সুজন মনে মনে মায়ের শহিদ তর্পণ আর নেতাদের ভাষণের মধ্যে তফাৎ খুঁজ ছিল।
মা ডাকলেন, 'সুজন'
'বলো''
'আমার একটা কথা রাখবি'
'তোমার কোন কথাটা রাখিনি মা'
'তবু'
'বলো'
'আমি চাই তোর ছেলে বাংলা মাধ্যমে পড়বে'
'ছেলে আবার কোথায় পেলে'
'একদিন তো হবে'।'তখন পড়াবি ,বল পড়াবি'
সুজন চুপ করে থাকে।
'কিরে, বললি না'
'তাই হবে মা'।
উঠোনে তখন এগারোটি প্রদীপ আলো ছড়াচ্ছে।
_____________
No comments:
Post a Comment