সুস্মিতা দেবনাথ
পৃথিবীতে সুখ দুঃখ চাকার মতো ঘুরছে। প্রতিটি মানুষই সুখ চায়। -দুঃখ এলে সকলে মুসড়ে পরে। ভাবে দুঃখের রাত বুঝি কাটবেনা। চিরকাল তো সমান যায় না। এসব কথা সে জ্ঞান হবার পর থেকে শুনে আসছে যে এক জীবনে দুঃখ তো আরেক জীবনে সুখ, সুখের পরে দুঃখ, দুঃখের পরে সুখ আসবেই। কিন্তু বাস্তবে দুঃখে যাদের জীবন তাদের সুখ আর আসে না কোনদিনও। অমলা ছোটবেলা থেকে দারিদ্রতার সাথে লড়াই করতে করতে, সৎ মায়ের অত্যাচার আর মদ্যপ বাবার হাত থেকে বাঁচতে একসময় পালিয়ে এসেছিল পাড়ার বিশুর সাথে, ভেবেছিল ভালো থাকবে বিশুর ভালবাসায়। পালিয়ে বেশ কিছু দিন ভালোই কেটেছিল, কিন্তু মোহ কাটতে বেশিদিন সময় লাগেনি। কয়েকদিন পরে চাহিদা মিটতেই বিশু অমলার পেটে সুজয়কে দিয়ে পালিয়ে গেল অমলার পাড়ার বান্ধবী কমলার সাথে। তবে বিশু চলে গেলেও বিশু তার চৌদ্দ পুরুষের প্রদত্ত এক চিলতে ভিটেটা রয়ে গেল অমলার জন্য। বিশু সেই যে গেল আর আসে নি গ্রামে,তবে কবে কোনদিন আবার ফিরে এসে ভিটাটা দাবী করে তার কোন ঠিক নেই। প্রথম প্রথম বিশুর জন্য অনেক কেঁদেছে কিন্তু একটা সময় অপেক্ষা করতে ভুলে গেছে অমলা।
সূজয়ের দিকে তাকিয়ে নতুন করে বাঁচার আশায় বাসাবাড়িতে কাজ নিয়েছে। দেখতে দেখতে সূরজ আজ নবম শ্রেণীতে। পাশেরই একটি সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করে। সুজয় ধীর-স্থির,শান্ত। জন্মের পর থেকে বাবাকে দেখে নি, মাকেই মা বাবা হিসেবে তার দুঃখের জন্যে লড়াই করতে দেখেছে। সারাদিন তিন চারটি বাসাবাড়িতে কাজ করে তার জন্য খাবার তৈরি করতে দেখেছে। তার যে মা ছাড়া কেউ নেই। তাই সে ছোট থেকে বুঝে গেছে তাকে অনেক বড় হতে হবে।
চারিদিকে একটা আতঙ্ক, সুজয় আজ কিছুদিন ধরেই দেখছে, মা আনমনা। আজও অমলা বাসা বাড়ির কাজ থেকে বাড়ি আসার পরে দেখলাে মায়ের চোখ ফোলা।
খাবারের সময় মার দিকে তাকিয়ে বলল কি হল তোমার মন খারাপ কেন?মা,তোমার শরীর ভালো নেই?
- কই নাতো?
-মা তুমি জানো,আমি অনেক বড় হয়ে গেছি।
ছেঁড়া শাড়ির আঁচলে চোখের জল মুছে অমলা কাঁচালঙ্কা দিয়ে ভাত মেখে সূজয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, নে খেয়ে নে, খেয়ে চুপচাপ পড়তে বসে যা। পেঁয়াজ নেই বাবা, শুধু কাঁচা লঙ্কা দিয়েই খেয়ে নে বাবা।ভীষন দাম রে পেঁয়াজের।
ভাতের গ্রাস মুখে দিতে দিতে সুজয় বললো,লাগবে না মা,খালি কাচালঙ্কা দিয়ে তোমার হাতের মাখাটারই আলাদা স্বাদ।
খাওয়া শেষ করে সুজয় মাটিতে বিছানা পেতে নিচে শুয়ে পড়ে। মাকে বলে, মা তুমি তাড়াতাড়ি আসো তোমায় একটা দারুন গল্প আজ পড়ে শোনাবো। তারা মা ছেলে রোজ কার মতো নানা গল্পের মাঝে নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ে। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আজ সুজয় তার বাংলা বইয়ের গল্প এপিজে আবদুল কালামের জীবনী পড়ে মাকে শোনাচ্ছিলো। আবদুল কালামের জীবনী শুনতে ভাবছিলো, তার ছেলেও খুব বড় মাপের মানুষ হবে। ঠিক যেমন করে কালাম জেলের ঘর থেকে বের হয়ে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছিলো,ঠিক তেমনি করে তার কুঁড়ে ঘরও সুরজ আলোকিত করবে আর সে আলোর ছটায় পৃথিবীর আলোকময় হয়ে উঠবে। অমলা তার ঘর্মাক্ত শরীরে সোনা রোদ গায়ে মেখে আনমনে গেয়ে উঠবে, "আলো আমার আলো, ওগো আলোয় ভুবন ভরা।"
No comments:
Post a Comment